রবিবার

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৯ ভাদ্র, ১৪৩৩

কর্ণফুলী ইপিজেডে দুই দশকে রপ্তানি ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৪৩

শেয়ার

কর্ণফুলী ইপিজেডে দুই দশকে রপ্তানি ১৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে
ছবি সংগৃহীত

দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (কর্ণফুলী ইপিজেড) দুই দশকের পথচলা পূর্ণ করেছে। ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইপিজেডটির উদ্বোধন করেন। ২০ বছরের পথচলায় কর্ণফুলী ইপিজেড থেকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য রপ্তানি হয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর কর্ণফুলী ইপিজেড থেকে প্রথম রপ্তানি শুরু হয় ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে। পাওলো ফুটওয়্যার (বিডি) লি. ইপিজেড থেকে প্রথম পণ্য রপ্তানি করে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৯.৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়ে রপ্তানির যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১৪,১৫৬.৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

কর্ণফুলী ইপিজেডের রপ্তানি শুধু গার্মেন্টসপণ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখান থেকে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী, বাইসাইকেল, চামড়াজাত পণ্য, ফার্নিচার, ব্যাগ, আন্ডারগার্মেন্টস, ফ্যাশন ও সেফটি শুর মতো পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে। এসব পণ্য দেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রখ্যাত ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কাছে এসব পণ্য সরবরাহ করা হয়।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) কর্ণফুলী ইপিজেডের দুই দশকের রূপান্তর ও বিকাশ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব তথ্য জানানো হয়।

চট্টগ্রাম স্টিল মিলস থেকে কর্ণফুলী ইপিজেড

মতবিনিময়কালে বন্ধ হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের জায়গায় কর্ণফুলী ইপিজেড গড়ে ওঠার দুই দশকের যাত্রার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বলেন, চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কর্ণফুলী নদীর তীরে একসময় চিটাগাং স্টিল মিলস লি. অবস্থিত ছিল। কর্ণফুলী নদীতীরে কারখানাটির অবস্থান হওয়ায় ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে এর অভ্যন্তরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সময়ের সঙ্গে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এবং ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার কারণে মিলটি ধীরে ধীরে লোকসানের মুখে পড়ে।

ফলশ্রুতিতে ১৯৯৮ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে লে-অফ ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চিটাগাং স্টিল মিলস লিমিটেড (সিএসএম) স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। এতে বহু শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর এলাকাটিতে নেমে আসে নীরবতা।

মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক জানান, এই অচলাবস্থা দূর করতে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী, বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চিটাগাং স্টিল মিলস লিমিটেডকে চট্টগ্রাম ইপিজেডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে পত্রের মাধ্যমে অনুরোধ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্টিল মিল এলাকার জমিতে ইপিজেড স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পতেঙ্গার এই এলাকাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বেপজার অধীনে নতুনভাবে শিল্পায়নের উদ্যোগ শুরু হয়।

২০০৪ সালে স্টিল মিলের জমি দুই ধাপে বেপজাকে হস্তান্তর করা হয়। প্রথম ধাপে ২২ ফেব্রুয়ারি ৭৪ একর এবং দ্বিতীয় ধাপে একই বছরের ২০ ডিসেম্বর ১৪৮.৪২ একর জমি হস্তান্তর করা হয়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বিলুপ্ত চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের সমুদয় জমি আনুষ্ঠানিকভাবে বেপজার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে জমি উন্নয়ন করা হয়। সেই জায়গাতেই গড়ে ওঠে আধুনিক ও পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা। সেখানে আধুনিক অবকাঠামো, কারখানা ও ইউটিলিটি সুবিধা একত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কর্ণফুলী ইপিজেড উদ্বোধন করেন।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অগ্রগতি

নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশের বিনিয়োগকারী কর্ণফুলী ইপিজেডে বিনিয়োগ করেছে। দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, জাপান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়া।

২০০৬-০৭ অর্থবছরে ১.৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা কর্ণফুলী ইপিজেডে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮৭.৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ইপিজেডের ২৫৮টি শিল্পপ্লটের প্রতিটির আয়তন ২ হাজার বর্গমিটার। এ ছাড়া পাঁচটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্টরি ভবনের মোট ফ্লোর স্পেস ৪৯ হাজার ৭৯৮ বর্গমিটার। এসব প্লট ও ভবনের পুরোটাই ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে কর্ণফুলী ইপিজেডে মোট ৪০টি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন, তিনটি যৌথ মালিকানাধীন এবং বাকি আটটি দেশীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিকের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এবং আরও প্রায় ১ লাখ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে কর্ণফুলী ইপিজেড।

মতবিনিময়কালে কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক, বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভির হোসেন, বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আনোয়ার পারভেজ এবং কম্পবেলি গ্লোবাল লিমিটেডের সিইও লি হেঙ্গো উপস্থিত ছিলেন।