নতুন অর্থবছরের শুরুতেই বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতার চিত্র সামনে এসেছে। রফতানি কমার বিপরীতে বেড়েছে আমদানি। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও সারের আমদানি ব্যয় বাড়ায় জুলাইয়ে পণ্য আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে অর্থবছরের প্রথম মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি ছাড়িয়েছে ২ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য সংক্রান্ত (বিওপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৫ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
অপরদিকে জুলাইয়ে পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে ৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের ৪ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কম। ফলে এক মাসেই পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার।
জ্বালানি ও সারে আমদানি ব্যয় বেড়েছে
জুলাইয়ে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি পণ্য ও সার আমদানি। এ মাসে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে ৮৩ শতাংশের বেশি।
সার আমদানিতেও বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাইয়ে সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৮৭ মিলিয়ন ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১২৫ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু এক মাসের তথ্য দিয়ে পুরো বছরের প্রবণতা বিচার করা ঠিক হবে না। আমদানি ও রফতানির এই বিপরীতমুখী প্রবণতা দীর্ঘায়িত হলে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বেশি
বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি সবচেয়ে বড়। চীন থেকে বিপুল পরিমাণ শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, রাসায়নিকসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। বিপরীতে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খোরশেদ আলমের মতে, এই ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে শুধু আমদানি কমানো কোনো সমাধান নয়; বরং চীনের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়াতে হবে।
তার প্রস্তাব, চীনের বিভিন্ন শহরে মেইড ইন বাংলাদেশ নামে পণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা দরকার। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, বিছানার চাদর, গৃহসজ্জার পণ্য, কাঠের পণ্যসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্য চীনা ভোক্তাদের কাছে তুলে ধরতে হবে।
চীন বাংলাদেশি অনেক পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মধ্যে চীনের বিশাল বাজার নিয়ে এক ধরনের ভয় কাজ করছে। চীন নিজেই যেখানে বিশ্বের অন্যতম বড় উৎপাদক, সেখানে বাংলাদেশের পণ্য সেখানে কতটা জায়গা পাবে—এমন ধারণা রয়েছে। তবে এই ধারণা বদলানো প্রয়োজন বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
চীনের সঙ্গে ঘাটতি কমাতে রফতানি বাড়ানোর পরামর্শ
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে রফতানি বাড়ানো। শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি একেবারে বন্ধ করা সম্ভব নয়।
বরং চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ ব্যবহার করে দেশে উৎপাদন বাড়ানো এবং সেই উৎপাদিত পণ্য চীনের বাজারে রফতানি করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয়। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদ, দুর্বল অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
খোরশেদ আলমের মতে, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে প্রযুক্তি হস্তান্তর জরুরি। চীনের উৎপাদন পদ্ধতি, প্রযুক্তি, শ্রম ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক উৎপাদন কৌশল বাংলাদেশে আনা গেলে দেশের শিল্পের সক্ষমতা বাড়বে।
ভারতের সঙ্গেও বড় বাণিজ্য ঘাটতি
চীনের পর বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে ভারতের সঙ্গে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও বাংলাদেশ ভারত থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার তুলনায় রফতানি করে খুবই কম।
২০২৫-২৬ ভারতীয় অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১০ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ ভারতে রফতানি করেছে প্রায় ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন থাকলেও ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, ভারতের বিশাল ভোক্তা বাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলক কম। ফলে ভারতকে শুধু আমদানির বাজার হিসেবে নয়, রফতানির বড় গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে নতুন বাজার জরুরি
বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির বড় কারণ হলো রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য কম এবং কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। তৈরি পোশাক দেশের রফতানির মূল চালিকাশক্তি হলেও দীর্ঘমেয়াদে শুধু একটি খাতের ওপর নির্ভর করে রফতানি বাড়ানো কঠিন।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল পণ্য, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্লাস্টিক পণ্য, গৃহসজ্জার পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবায় রফতানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়াতে বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য শুধু আমদানি কমানোর দিকে নজর দিলে হবে না, রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে পোশাকসহ রফতানি খাতকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি এবং ব্যবসার খরচ কমানো জরুরি।
তিনি বলেন, চীন, ভারতসহ বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে সে জন্য পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশের বাধা দূর করতে হবে। আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি যেন উৎপাদন বাড়িয়ে রফতানি আয়ে রূপ নেয়, সে ধরনের নীতি নিতে হবে। তাহলেই বাণিজ্য ঘাটতি ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব হবে।
রেমিট্যান্সে সাময়িক স্বস্তি
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ আপাতত বৈদেশিক লেনদেনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে দেয়নি। জুলাইয়ে প্রবাসীরা দেশে প্রায় ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। ফলে জুলাইয়ে চলতি হিসাবে ৬৪ মিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। তবে আগের বছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত ছিল ১২৫ মিলিয়ন ডলার।
তবে রেমিট্যান্স দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ঘাটতির কাঠামোগত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। রফতানি আয় বাড়াতে না পারলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ধরে রাখতে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হবে।
আর্থিক হিসাবেও ঘাটতি
জুলাইয়ে আর্থিক হিসাবেও ৬৭৭ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি হয়েছে। একই সময়ে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে। জুলাইয়ে বাংলাদেশ প্রায় ১১৬ মিলিয়ন ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম।
বাণিজ্য ঘাটতির পাশাপাশি এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ রফতানি বাড়াতে শুধু পণ্য বিক্রির বাজার নয়, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগও প্রয়োজন।
আমদানি কমানো নয়, উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানোর তাগিদ
বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি নতুন কোনো সমস্যা নয়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরও শেষ হয়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে। এটি দেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পথ আমদানি বন্ধ করা নয়। বরং আমদানিকে উৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। জ্বালানি ও শিল্প খাতের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধান, রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, বড় বাজারগুলোতে অশুল্ক বাধা কমাতে কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতি ও অবকাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।
চীন ও ভারতের সঙ্গে শুধু আমদানি-নির্ভর সম্পর্ক নয়, বিনিয়োগ ও উৎপাদনভিত্তিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। চীনের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাংলাদেশে এনে উৎপাদন বাড়িয়ে সেই পণ্য চীনসহ তৃতীয় দেশের বাজারে রফতানি করা গেলে ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, সব ধরনের আমদানি নেতিবাচক নয়। শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ রফতানি বাড়ানোর জন্য অপরিহার্য।
তিনি মনে করেন, সামগ্রিকভাবে আমদানি সংকোচনের পরিবর্তে বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে রফতানি বহুমুখীকরণ, বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
তার মতে, প্রবাসী আয় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আনার ব্যবস্থা জোরদার, নমনীয় বিনিময় হার বজায় রাখা এবং সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব। তবে স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগ যাতে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।
আরও পড়ুন:







