দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প সুরক্ষায় বন্ডের আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানির সুবিধা প্রত্যাহার করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রপ্তানিকারকদের সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি আমদানিকৃত সুতার শুল্ক-করের সমপরিমাণ অর্থের নিঃশর্ত ও অব্যাহত ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে।
সোমবার জারি করা এনবিআরের আদেশে বলা হয়েছে, আমদানিকৃত সুতা দিয়ে প্রস্তুত পণ্য সম্পূর্ণ রপ্তানি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা যাবে।
সিদ্ধান্তকে সাহসী ও সময়োপযোগী বলছেন মিল মালিকরা
বিটিএমএর সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজিব হায়দার এ সিদ্ধান্তকে সাহসী ও সময়োপযোগী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, গত তিন বছরে অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে। চালু থাকা মিলগুলোও সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন করতে পারছে না। অনেক মিল আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, টেক্সটাইল শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবন করে সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে শিল্পটি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
রাজিব হায়দারের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন বাড়ানোর যে শর্ত রয়েছে, তা পূরণে এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক উভয় শিল্পই উপকৃত হবে এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহারও কমবে।
স্থানীয় সুতার চাহিদা বাড়ার প্রত্যাশা
সাধারণ স্পিনিং মিল মালিকদের মতে, বন্ড সুবিধার কারণে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনযোগ্য ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতার চাহিদা ও দেশীয় মিলগুলোর সক্ষমতার ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তাদের মতে, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় সুতার চাহিদা বাড়বে। বন্ধ ও আংশিক বন্ধ মিলগুলো পুনরায় সচল হওয়ার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের সুযোগ বাড়বে। ব্যাংক ব্যবস্থায় বিদ্যমান খেলাপি ঋণ কমারও সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে তারা মনে করছেন।
তাদের মতে, দেশে উৎপাদিত সুতা ব্যবহারের ফলে তৈরি পোশাক শিল্পে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়বে। একই সঙ্গে সুতা আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমবে। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা সুতা স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি বা অপসারণের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়তে পারে।
দেশে সুতার উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় চাহিদার সমান
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, বস্ত্র খাতে দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকা। স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর বছরে ৩৯৭ কোটি কেজি সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। বিপরীতে দেশে সুতার বার্ষিক চাহিদা ৪০০ কোটি কেজি। অর্থাৎ উৎপাদন ঘাটতি মাত্র ৩ কোটি কেজি।
অন্যদিকে কাপড়ের বার্ষিক চাহিদা ৩৭০ কোটি কেজি। এর বিপরীতে টেক্সটাইল মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৩২৫ কোটি কেজি। ফলে কাপড়ের উৎপাদন ঘাটতি রয়েছে ৪৫ কোটি কেজি।
আমদানি তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৩ কোটি কেজি সুতার ঘাটতির বিপরীতে ১২১ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়েছে। আর ৪৫ কোটি কেজি কাপড়ের ঘাটতির বিপরীতে আমদানি হয়েছে ১০৮ কোটি কেজি কাপড়। সুতা বেশির ভাগ আমদানি হয়েছে ভারত থেকে এবং কাপড় চীন থেকে।
তিন বছরে বেড়েছে কটন সুতা আমদানি
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯৩ দশমিক ৫ কোটি ডলারে ২২ কোটি কেজি কটন সুতা আমদানি হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪৯ কোটি ডলারে আমদানি হয় ৪৫ দশমিক ৫ কোটি কেজি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে কটন সুতা আমদানি আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৯ কোটি ডলারে। ওই অর্থবছরে ৫৫ দশমিক ৬ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়েছে।
বন্ড লাইসেন্সবিহীন রপ্তানিকারকদের পর এবার বন্ডেড প্রতিষ্ঠান
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্সবিহীন রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতাসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় এনবিআর। বর্তমানে একই সুবিধা বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় আমদানিকৃত সুতা দিয়ে প্রস্তুত পণ্য সম্পূর্ণ রপ্তানি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা যাবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে সুতা আমদানি বা রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
আরও পড়ুন:







