বুধবার

২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮ ভাদ্র, ১৪৩৩

২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চায় বিপিসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:০২

শেয়ার

২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চায় বিপিসি
ছবি বাংলা এডিশন

বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে কম দামে বিক্রি করায় চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি।

যুদ্ধের উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও পাঁচ মাসে এ খাতে সরকারের ১১ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম না কমলে চলতি বছর সরকারের মোট লোকসান অন্তত ৩২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বিপিসি জানিয়েছে, মার্চ থেকে সরকার সংস্থাটিকে কোনো ভর্তুকি দেয়নি। এখন কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি না দিলে জ্বালানি তেল আমদানি অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স ট্রেড করপোরেশনের (আইটিএফসি) বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধও হুমকির মুখে পড়বে।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধানের সঙ্গে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তেল আমদানিতে লোকসান ও আর্থিক সংকটের পুরো চিত্র জ্বালানি বিভাগকে জানানো হয়েছে।

পাঁচ মাসে ২০ হাজার ৫৯ কোটি টাকা লোকসান

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির কারণে মার্চে ২ হাজার ২৪৮ কোটি ৩৭ লাখ, এপ্রিলে ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি ৩ লাখ, মে মাসে ২ হাজার ৬২১ কোটি ২৮ লাখ, জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি ৫৮ লাখ এবং জুলাইয়ে ১ হাজার ১২৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। পাঁচ মাসে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

এর মধ্যে ১৮ এপ্রিল এমভি ক্যাপ বনি নামের একটি জাহাজে আনা ৩৩ হাজার ৩৭৯ টন ডিজেলের বিল প্রতি লিটার ২৭০ টাকা ৩২ পয়সা দরে পরিশোধ করতে হয়। তখন দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল ১০০ টাকা লিটার দরে। ফলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান হয় ১৭০ টাকারও বেশি। ওই এক পার্সেল জাহাজের ডিজেলেই বিপিসির লোকসান হয়েছে ৬৭২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম না কমলে বাড়বে ভর্তুকি

জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে তেলের দাম না কমলে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারকে গড়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১৭২ টাকা ৫৪ পয়সা, অকটেন ১৪৬ টাকা এবং পেট্রোল ১৪২ টাকায় কিনতে হতে পারে। এ হিসাবে ডিজেলে প্রতি লিটারে ৫৭ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হবে।

আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে। বিষয়টি জ্বালানি বিভাগ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। বর্তমানে ব্র্যান্ড ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৯১ ডলারের বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর মার্চ থেকে বিপিসির লোকসানের হিসাব বাড়তে থাকে।

তিন মাসে জ্বালানি আমদানিতে প্রয়োজন ২৮ হাজার কোটি টাকা

বিপিসির হিসাবে, সেপ্টেম্বর মাসে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, মেরিন ফুয়েল, এএলসি, মারবান ও এলপিজি মিলিয়ে ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন জ্বালানি কিনতে হবে। এতে ব্যয় হতে পারে ৮ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা।

অক্টোবরে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন জ্বালানি কিনতে প্রয়োজন হবে ৮ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। নভেম্বরে ৭ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি কিনতে লাগবে ১১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে জ্বালানি পণ্যের বিল পরিশোধে প্রয়োজন হবে ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

বিপিসি জানিয়েছে, কয়েক বছরের লাভের অর্থে সংস্থাটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা জমা ছিল। এর মধ্যে সরকার ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। অবশিষ্ট অর্থ ইস্টার্ন রিফাইনারি-২সহ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য রাখা হয়েছিল। চলতি বছর যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট আর্থিক চাপের ফলে সেই অর্থও শেষ হওয়ার পথে। বর্তমানে অনেক কষ্টে তেল আমদানির এলসি করছে বিপিসি।

তেল আমদানিতে সরকারের শুল্ক-কর আয়ও বেড়েছে

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে সরকার ফেব্রুয়ারিতে শুল্ক ও ভ্যাট বাবদ ১৮ টাকা ৩৬ পয়সা পেয়েছে। দাম বাড়ার কারণে মার্চে তা বেড়ে ৩৮ টাকা ৬৪ পয়সা, এপ্রিলে ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা এবং জুলাইয়ে ২৯ টাকা ৭৪ পয়সা হয়েছে।

এপ্রিলে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে মোট ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা শুল্ক ও কর আদায় হয়েছে। এর মধ্যে শুল্ক ৮ টাকা ৯৭ পয়সা, ভ্যাট ২৩ টাকা ৭৭ পয়সা, এটিআই ৩ টাকা ১৭ পয়সা এবং এআইটি ২ টাকা ৯৯ পয়সা।

ভর্তুকি, কর ছাড় বা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

বিপুল লোকসানের মুখে থাকা বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম প্রধান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জ্বালানি বিভাগকে তেল আমদানি স্বাভাবিক রাখতে তিনটি বিকল্পের কথা জানানো হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার ৫৯ কোটি টাকার ভর্তুকি দেওয়া, মার্চ থেকে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগের হারে শুল্ক-কর প্রদান অথবা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো।

তেল আমদানির পুরো পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও অবহিত করার জন্য জ্বালানি বিভাগকে অনুরোধ করেছেন বিপিসির চেয়ারম্যান।