বুধবার

২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮ ভাদ্র, ১৪৩৩

রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে পে স্কেলের বড় ব্যয়, চাপে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩২

শেয়ার

রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে পে স্কেলের বড় ব্যয়, চাপে সরকার
ছবি সংগৃহীত

জ্বালানি সংকট, রাজস্ব আহরণে স্থবিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন এই পে স্কেলে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এর বিশাল আর্থিক জোগান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে একযোগে সব ভাতা কার্যকর হলে বছরে বেতন-ভাতায় সরকারের ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। এই ব্যয় গত অর্থবছরে আহরিত রাজস্বের প্রায় অর্ধেক। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত লাগবে।

বেতন-ভাতা বাড়ায় মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মচারীদের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বেতন-ভাতা একবার বাড়লে পরবর্তী বছরগুলোতেও সেই ব্যয় বহাল থাকবে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণ, ঋণ ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেসরকারি বিনিয়োগের সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, পে স্কেলের প্রভাবে বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ তৈরি হলে চাহিদা বাড়তে পারে। পাশাপাশি নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার আগেই অসাধু ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালাদের কেউ কেউ এর সুযোগ নিয়ে নিত্যপণ্যের দাম ও বাড়িভাড়া বাড়াতে পারেন। অতিরিক্ত বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ঋণ নিলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।

প্রজ্ঞাপন ও বেতন নির্ধারণে লাগতে পারে এক মাস

অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও এক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। অর্থ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব জানিয়েছেন, নতুন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হতে আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ লাগতে পারে। এরপর নতুন কাঠামো অনুসারে বেতন নির্ধারণ করা হবে। পরে তা আইবাস প্লাস প্লাসে যুক্ত করা হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে এক মাস সময় লাগতে পারে।

রাজস্ব ঘাটতিও বড় চ্যালেঞ্জ

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব দিয়ে বাজেটের পুরো ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে এনবিআর রাজস্ব আহরণ করেছে চার লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থবছর শেষে বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে ব্যয় সংকোচন ও রাজস্ব আহরণে জোর দিতে হবে সরকারকে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ সংশ্লিষ্ট খাতে মোট এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে এই ব্যয় আরও বাড়বে।

জ্বালানি সংকটেও বাড়ছে আর্থিক চাপ

দেশে এমন সময় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে, যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট চলছে। জ্বালানি সংকটে দেশের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। সহসা এই সংকট কাটার লক্ষণও দেখছে না সরকার।

জ্বালানি সংকট কাটতে দুই বছরের বেশি সময় লাগবে বলে একাধিকবার জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এর প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় রাজস্ব আহরণের গতিও কমেছে।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা

দেশে দীর্ঘ চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী থাকায় নতুন পে স্কেলের প্রভাবে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে সরকারি বেতন বাড়ার প্রভাবে নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া পর্যন্ত বিভিন্ন খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের আয় একই হারে না বাড়লে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও এই পে স্কেল শ্রমবাজারের সিংহভাগ জুড়ে থাকা বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তাদের আয় না বাড়লেও খরচ বাড়বে, যা সামাজিক বৈষম্য ও তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

ব্যাংক ঋণেও বাড়তে পারে চাপ

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্য এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

এই ঋণ পরিকল্পনার সঙ্গে নতুন পে স্কেলের বাড়তি অর্থায়ন যুক্ত হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে শিল্পের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন। সরকার বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংক থেকে নিলে ব্যাংকের সীমিত আমানত ও তারল্যের একটি অংশ সেদিকে চলে যেতে পারে।

তবে নতুন বেতন কাঠামোর ফলে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে পারে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা গতি আসতে পারে। এর পাশাপাশি রাজস্ব ঘাটতি, সরকারি ঋণ, সুদ ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর পর মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা কর্মচারীদের জন্য এই পে স্কেল অত্যন্ত দরকারি ছিল। তবে তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

সব মিলিয়ে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব ঘাটতি, সরকারি ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোই সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।