মঙ্গলবার

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭ ভাদ্র, ১৪৩৩

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বিদেশি অংশীদার খুঁজছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৪৫

শেয়ার

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বিদেশি অংশীদার খুঁজছে সরকার
ছবি সংগৃহীত

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটির ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়াতে বিদেশি কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে সরকার। ব্যাংকটির মূলধন শক্তিশালী করা, খেলাপি ঋণ আদায়, তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে কাতার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ইসলামি দেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।

গত ১৭ ও ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর কাতার সফর করেন। সফরকালে তিনি কাতার সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মূলধন ও তারল্য সংকট কাটাতে উদ্যোগ

বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে দীর্ঘদিন আমানত ফেরত দিতে না পারায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।

পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের মোট এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৮৬ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি রয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।

গত বছরের নভেম্বরে সরকারি মালিকানার ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে গতিশীল করে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশি কৌশলগত অংশীদার খোঁজা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকটিকে পুরোপুরি কার্যকর করতে আরও অর্থের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের সামনে দুটি বিকল্প রয়েছে। সরকার নিজে আরও অর্থ জোগান দিতে পারে অথবা কৌশলগত অংশীদার যুক্ত করতে পারে। সরকার দ্বিতীয় বিকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি কাতার সফরে এ বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশকেও বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হবে।

কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাতারের আগ্রহকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার। পাশাপাশি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য ইসলামি দেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ সফল হলে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।

৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতের মূল টাকা ফেরত

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ্যে আমানত সুরক্ষা ও অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবধারী গ্রাহকদের মূল আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে গ্রাহকেরা তাদের হিসাবের সম্পূর্ণ মূল অর্থ এককালীন উত্তোলন বা নগদায়ন করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না।

এ জন্য মঙ্গলবার থেকে ব্যাংকটির শাখাগুলোতে আবেদন গ্রহণ শুরু হবে।

ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে সব বিভাগীয় প্রধান, জোনাল প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপককে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও নির্দেশনা অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অপারেশনসের প্রধান সমন্বয়ক এ এফ সাব্বির আহমদ স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বিষয়টি জানানো হয়।

স্বাভাবিক লেনদেন ফেরাতে প্রস্তুতি

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, সরকারের সহযোগিতায় ব্যাংকের কার্যক্রম পুনর্গঠনের কাজ চলছে, যাতে দ্রুত স্বাভাবিক লেনদেন শুরু করা যায়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও পরিচালনা পর্ষদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকরা যাতে নতুন হিসাব খুলতে পারেন এবং নির্বিঘ্নে টাকা জমা ও উত্তোলন করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা তুলতে না পারার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, মঙ্গলবার থেকে আবেদন নেওয়া শুরু হবে। প্রতিটি শাখার প্রয়োজনীয় অর্থের চাহিদা পর্যালোচনা করে সে অনুযায়ী টাকার জোগান দেওয়া হবে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য একটি বিশেষ ‘ওয়ার রুম’ গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে ব্যাংকের কর্মীরা সরাসরি ঋণের অর্থ উদ্ধারের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।

খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রায় ১০ হাজার মামলা

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজার মামলা করেছে। আরও মামলা করার প্রক্রিয়াও চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ব্যাংকটির ঋণ আদায়, পুনর্গঠন ও সার্বিক কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করছে। ঋণ উদ্ধারে ব্যাংকটি পৃথক ‘কালেকশন অ্যান্ড রিকভারি ওয়ার রুম’ গঠন করেছে। সেখানে বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে কাজ চলছে।