বৃহস্পতিবার

২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২ ভাদ্র, ১৪৩৩

সেতু কর্তৃপক্ষের সভার সম্মানি ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১৫:১১

শেয়ার

সেতু কর্তৃপক্ষের সভার সম্মানি ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার
ছবি বাংলা এডিশন

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) বোর্ড সদস্যদের প্রতি সভায় অংশগ্রহণের সম্মানি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এতে এক সভায় সদস্যদের সম্মানি বেড়েছে ৭ হাজার টাকা বা ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত বিবিএর ১১৭তম বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং সেতু কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শেখ রবিউল আলম।

সম্মানি বাড়ানোর কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি

সভায় সেতু বিভাগের সচিব ও বিবিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ সম্মানি বাড়ানোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে বোর্ড সদস্যদের সভার সম্মানির হার অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই হার আর উপযুক্ত নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রস্তাবে বলা হয়, এর আগে বোর্ড সদস্যরা প্রতি সভায় ৮ হাজার টাকা সম্মানি পেতেন। ২০১৮ সালের পর থেকে বিভিন্ন সরকারি কর্তৃপক্ষ, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় বোর্ড সভার সম্মানির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকেও সম্মানি বাড়ানোর যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়।

সভায় সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক ও সদস্য-সচিব আবদুর রউফ বলেন, বোর্ড সদস্যরা কর্তৃপক্ষের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয় অনুমোদন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সার্বিক পর্যালোচনায় বর্তমান সম্মানির হার সময়োপযোগী না হওয়ায় এবং দায়িত্বের গুরুত্ব ও অন্যান্য সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে বিদ্যমান সম্মানির হার বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ. কে. এম শাহাবুদ্দিন বলেন, বিবিএর বোর্ড সভার সম্মানি সমজাতীয় অন্যান্য সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন আইডিসিওএল, সেজিস, আইআইএফসি ও আইডব্লিউএম-এর বোর্ড সদস্যদের সম্মানির হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে।

বিস্তারিত আলোচনার পর বোর্ড সদস্যদের সভার সম্মানি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়।

নিজেদের সম্মানি নিজেরাই নির্ধারণের প্রশ্ন

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৬ অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বর্তমানে সেতু বিভাগের সচিবই আবার বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে আইনের ১৫ সদস্যের বোর্ডে কার্যত ১৪ জন ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করছেন।

সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, সেতু বিভাগের সচিব ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ নিজেই বোর্ড সভায় সম্মানি বাড়ানোর বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে অন্যান্য সদস্য মিলে সম্মানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ, সভার সম্মানি কারা পাবেন এবং কত পাবেন, তা নির্ধারণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিরাই প্রস্তাবক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।

বিবিএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সম্মানি বাড়িয়ে নেওয়ার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। তাদের মতে, এ ধরনের সম্মানি স্বাধীন কোনো বেতন বা ভাতা কমিশনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত অথবা সরাসরি সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম, যেমন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্ধারণ করা বাঞ্ছনীয়। নিজেদের পছন্দমতো সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে নিজেরাই নিজেদের সম্মানি নির্ধারণ করা কোনোভাবেই নৈতিক হতে পারে না।

সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে বড় ব্যবধান

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্যের সঙ্গে সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সদস্যদের সম্মানির তুলনা করলে দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি চিত্র ফুটে ওঠে। জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে গড়ে ৪ দশমিক ২৬ সদস্যের একটি সাধারণ পরিবারের মাসিক গড় আয় ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। দেশের সাধারণ মানুষের মাথাপিছু গড় মাসিক আয় ৭ হাজার ১৪ টাকা।

অর্থাৎ, একজন সাধারণ মানুষ পুরো এক মাসে যে পরিমাণ টাকা আয় করেন, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কয়েক ঘণ্টার একটি বোর্ড সভায় অংশ নিয়ে তার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ সম্মানি হিসেবে পাবেন।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বিশ্লেষকরা সম্মানি বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অমর্যাদাকর, স্বার্থের সংঘাত ও ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সরকারি সচিবরা এমনিতেই উল্লেখযোগ্য বেতন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। সেখানে সভার জন্য আলাদাভাবে সম্মানি বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিশ্লেষকরা আরও বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আমলারা সরকারি অর্থে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পান। তাই নিজেদের সভার সম্মানি বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে কারণ হিসেবে দেখানো অযৌক্তিক। বিশেষ করে অফিস চলাকালীন সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে কোনো সরকারি দপ্তরের বোর্ড সভায় অংশ নেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত অর্থ বা সম্মানি নেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে।

টিআইবির সমালোচনা

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সদস্যদের সম্মানি বাড়ানোর বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদাধিকারবলে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বোর্ড সভায় উপস্থিতির জন্য আলাদা সম্মানি ভাতা নেওয়ার কোনো নীতিগত যৌক্তিকতা নেই।

এ ধরনের সিদ্ধান্তকে গ্রহণযোগ্যতাহীন সংস্কৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজেদের সিদ্ধান্তে নিজেদের ভাতা বাড়ানো অত্যন্ত অনৈতিক ও লজ্জাজনক।

তিনি আরও বলেন, বোর্ড সভায় অংশগ্রহণকে কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছেন এবং জনগণের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। দেশের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের এমন অপচয় ও অপব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু নীতিমালার পরিপন্থি নয়, সাধারণ মানুষের ওপর এক ধরনের অন্যায় ও চরম ক্ষমতার অপব্যবহারের নামান্তর।

বিবিএর ব্যাখ্যা

সম্মানি বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমতা বজায় রেখেই ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বোর্ডের পূর্বনির্ধারিত ভাতা অনেক আগে ধার্য করা হয়েছিল। বর্তমানে সরকার বিভিন্ন ভাতা ও পরীক্ষার ফি বাড়িয়েছে। আগে ১০ শতাংশ ভ্যাট ও ট্যাক্স কাটার নিয়ম থাকলেও বর্তমানে সরকার ২০ শতাংশ কর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ১৫ হাজার টাকা ভাতা নির্ধারণ করা হলেও ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ ৩ হাজার টাকা সরকারি খাতে চলে যাবে এবং প্রকৃতপক্ষে তা ১২ হাজার টাকায় দাঁড়াবে।

তিনি আরও বলেন, আইএএফসি, ইটক্যাল কিংবা ন্যাচারাল বোর্ডের মতো অন্যান্য সংস্থায় একই হারে ভাতা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মতো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো নিজস্ব আয় থেকে ব্যয় নির্বাহ করে এবং সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। সরকারি নীতি ও অন্যান্য সমমানের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।