সোমবার

২৪ আগস্ট, ২০২৬ ৯ ভাদ্র, ১৪৩৩

পরিচালকদের ২ লাখ কোটি টাকায় চাপে ৪২ ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:২৬

শেয়ার

পরিচালকদের ২ লাখ কোটি টাকায় চাপে ৪২ ব্যাংক
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

বেসরকারি ব্যাংকের প্রায় ৫০০ পরিচালক ৪২টি ব্যাংক থেকে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। বিধিবিধান অনুযায়ী পরিচালকদের ঋণ নেওয়ার সীমার তুলনায় এই অঙ্ক অনেক বেশি। কেউ নিয়মিত কিস্তি দিলেও অনেকে ঋণ পরিশোধ করছেন না। আবার আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সামান্য টাকা জমা দিয়ে খেলাপি হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করে নতুন করে ঋণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং পরিচালকদের ঋণের নথি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

নির্ধারিত সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি ঋণ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একজন পরিচালক একটি ব্যাংকের ২ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার কিনতে পারেন। বর্তমান ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধন সাধারণত ৫০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার নিতে পারেন একজন পরিচালক। আর যেকোনো ব্যাংক থেকে পরিচালকের ঋণ নেওয়ার সীমা নিজস্ব শেয়ারের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ ২৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই।

সে হিসাবে ৪২টি বেসরকারি ব্যাংকের ৫০০ পরিচালক ঋণ নিলে সর্বোচ্চ ঋণের পরিমাণ হওয়ার কথা ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অথচ বর্তমানে পরিচালকদের ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঙ্ক সম্পূর্ণ বেআইনি।

তাদের অভিমত, পরিচালকদের একটি বড় অংশ কৌশলে নিজের ব্যাংকের পাশাপাশি অন্য ব্যাংক থেকেও মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়েছেন। এর সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তা কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকায়। তবে ২০২৫ সালের জুন থেকে ঋণের পরিমাণ আবার বাড়তে থাকে। বর্তমান সরকার গঠনের পর গত জুনে ৪২টি ব্যাংকের কাছে পরিচালকদের ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের অসহায়ত্বের অভিযোগ

বাণিজ্যিক ব্যাংকের অন্তত ১২ জন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, পরিচালকদের ঋণ বিতরণ ও এর ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। পরিচালকরা একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের উদ্যোক্তা হওয়ায় নির্বিঘ্নে ঋণ নেওয়া ও খেলাপি হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পরে কৌশলে আবার ঋণও নিচ্ছেন তারা।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, এটি এক ধরনের স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অবৈধ হওয়ার পরও বছরের পর বছর তা চলছে। এতে ব্যাংক ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইন থাকার পরও পরিচালকরা ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংকের নির্বাহীরা অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন। পরিচালকদের হাতে অতিরিক্ত ঋণ থাকায় অন্য গ্রাহকরাও ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

ঋণ আদায়ে ব্যাংককেই দায়িত্ব নিতে হবে

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক পরিচালক স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবশালী এবং তাদের কাছে অনেক ঋণ আটকে আছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ আদায়ে মূল দায়িত্ব ব্যাংককেই পালন করতে হবে। পরিচালক হলেই সব ঋণ মাফ করতে হবে, এমন নয়।

তিনি বলেন, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর উচিত চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলা। সেখানে সমাধান না হলে ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপায় চাইতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে এ বিষয়ে উপায় বের করতে পারে।

২০১৩ সাল থেকে সংকট বাড়ার অভিযোগ

পরিচালকদের ঋণের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংক খাতে সংকটের শুরু ২০১৩ সালে। ওই সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্তত নয়টি ব্যাংক অনুমোদন পায়। এসব ব্যাংকের অধিকাংশ পরিচালক ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ব্যাংকে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন।

এস আলম, সালমান এফ রহমান, নজরুল ইসলাম মজুমদার ও জয়নুল হক সিকদার চক্র আরও আগে থেকেই ব্যাংক খাতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৭ সালে এস আলমের ইসলামী ব্যাংক দখলের পর ব্যাংক লুটপাটের শঙ্কা সৃষ্টি হয়। এরপর ব্যাংক পরিচালকদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার অভিযোগও বাড়তে থাকে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে পরিচালকদের ঋণ ছিল ৯০ হাজার কোটি টাকা। ১০ বছর পর গত জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায়।

কোন কোন ব্যাংক ঋণ দিয়েছে

নিজ ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পূবালী, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, ব্যাংক এশিয়া, শাহ্‌জালাল ইসলামী, ডাচ্‌-বাংলা, প্রাইম, ঢাকা ব্যাংক, সাউথইস্ট, ব্র্যাক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, প্রিমিয়ার ও সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক।

অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পূবালী, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, শাহ্‌জালাল ইসলামী, ডাচ্‌-বাংলা, প্রাইম, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সাউথইস্ট, ব্র্যাক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক এবং সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক।

পরিচালকদের ঋণে নজর দেওয়ার নির্দেশ

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের নেতারা সাক্ষাৎ করেন। এ সময় খেলাপি ঋণ আদায়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন গভর্নর। পাশাপাশি পরিচালকদের ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও তার নজরে আসে। ব্যাংক পরিচালনায় নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেন তিনি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের প্রধান ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, এখন ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। পরিচালকরা ব্যাংক খাতের উন্নয়নে সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ম অনুযায়ী চলছে। যথাযথ নিয়ম মেনে যাচাই-বাছাই করেই ঋণ বিতরণ করা হয়। পরিচালকদের ঋণ পাওয়া দোষের কিছু নয় এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনে এর বিধান রয়েছে।

নিয়ম মেনে ঋণ দেওয়ার তাগিদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংক পরিচালকরা প্রয়োজনে ঋণ নিতে পারেন। তবে তাদেরও সাধারণ গ্রাহকের মতো শর্ত ও বন্ধকি সম্পদ রেখে ঋণ নেওয়া উচিত। ব্যাংকের উচিত ঋণের মানদণ্ড মেনে চলা এবং কোনো বাড়তি সুযোগ-সুবিধা না দেওয়া।

তিনি বলেন, বিশেষ যোগসাজশ বা আঁতাতের মাধ্যমে শর্ত না মেনে ঋণ বিতরণ করলে আগের মতো সংকট দেখা দেবে। মানুষের ব্যাংকের ওপর আস্থা কমে গেছে। এ ধরনের অপসংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার সময় এসেছে। চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এবং তারাই আবার ব্যাংকের মালিক। ব্যাংক পরিদর্শনে যা উঠে আসবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক পরিচালকরা প্রয়োজনে ঋণ নিতে পারেন। কিন্তু সীমা অতিক্রম করার সুযোগ নেই। এত টাকার ঋণ মালিকদের কাছে কীভাবে গেল এবং নিয়ম অনুযায়ী তাদের কাছে এত টাকা থাকার সুযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত। খেলাপিরা পরিচালক থাকতে পারেন না। ব্যাংকগুলো কেন ব্যবস্থা নেয় না, এর একটি সুরাহা দরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত সব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ব্যাংক পরিচালনা, নজরদারি ও পরিচালকদের ঋণসহ সব বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংক দেখভাল করবে। বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ তারা দেখেন না এবং এসব ঋণের তথ্যও তাদের কাছে আসে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হবে।



banner close
banner close