শুক্রবার

১৭ জুলাই, ২০২৬ ২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

ইইউ বাজারে বাংলাদেশি পোশাক রফতানিতে বড় ধাক্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ জুলাই, ২০২৬ ১০:২৭

শেয়ার

ইইউ বাজারে বাংলাদেশি পোশাক রফতানিতে বড় ধাক্কা
ছবি সংগৃহীত

ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে উদ্বেগজনক পতনের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে রফতানি আয়, রফতানির পরিমাণ এবং ইউনিট মূল্য-এই তিন সূচকেই উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু সাময়িক বাজার মন্দার প্রভাব নয়; বরং দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও মূল্যসংযোজনভিত্তিক উৎপাদন নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য: সবচেয়ে বেশি ধাক্কা বাংলাদেশের

ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। শীর্ষ ১০টি পোশাক সরবরাহকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই আমদানি সবচেয়ে বেশি কমেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৮৯৭ কোটি ১৩ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি ৬৯ লাখ ইউরোতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১৬৯ কোটি ৪৪ লাখ ইউরোর রফতানি আয় কমেছে।

একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৭৫৮ কোটি ইউরো থেকে ৩ হাজার ৩৮৪ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে। তবে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পরিমাণ ও ইউনিট মূল্যও কমেছে

বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্ববাজারে ইইউর পোশাক আমদানি কমার পেছনে চাহিদা হ্রাস এবং মূল্য কমে যাওয়ার প্রভাব রয়েছে। এ সময়ে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। জানুয়ারি থেকে মে সময়ে ইইউতে বাংলাদেশি পোশাকের আমদানির পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১৫ দশমিক ৪১ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরোতে নেমেছে, যা ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ হ্রাস।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত কোনো দেশ কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করে বাজার ধরে রাখে অথবা উচ্চমূল্যের পণ্য বিক্রি করে আয় ধরে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ ও পণ্যের দাম কমে যাওয়ায় রফতানি আয়ের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

শুধু মে মাসের চিত্রও একই ধরনের প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল ইইউ। চলতি বছরের একই মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ২৬ লাখ ইউরোতে, যা ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ইউনিট মূল্য ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ কমেছে।

প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ

প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীন থেকে ইইউর পোশাক আমদানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। দেশটি আমদানির পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ বাড়িয়ে বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হলেও ইউনিট মূল্য কিছুটা কমেছে।

ভিয়েতনামের রফতানি মূল্য কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। দেশটি উচ্চমূল্যের পণ্য রফতানি করে ইউনিট মূল্য ১২ শতাংশের বেশি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যদিও রফতানির পরিমাণ কিছুটা কমেছে।

তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে রফতানির পরিমাণ কমলেও ইউনিট মূল্য বেড়েছে। পাকিস্তানের রফতানি মূল্য ১৭ শতাংশ কমলেও দেশটির রফতানির পরিমাণ প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে মূল্য ও পরিমাণ উভয় সূচকেই পতন থাকলেও তা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। অন্যদিকে, ইন্দোনেশিয়ার রফতানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি কমলেও মূল্যহ্রাস বাংলাদেশের মতো তীব্র নয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই এমন অবস্থায় রয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে রফতানির পরিমাণ ও ইউনিট মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ভিয়েতনাম মূল্য ধরে রাখতে পেরেছে, চীন পণ্যের পরিমাণ ধরে রেখেছে, কিন্তু বাংলাদেশ দুই ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এপ্রিলে যে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, মে মাসেও তা অব্যাহত রয়েছে। এটি আর সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতায় কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর মতে, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু কম দামে পণ্য বিক্রির কৌশলের ওপর নির্ভর না করে উচ্চমূল্যের ও মূল্যসংযোজিত পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার কৌশলে গুরুত্ব দিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে বাড়তে পারে চাপ

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইইউতে এই ধারাবাহিক পতন দীর্ঘমেয়াদে দেশের রফতানি আয়, শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশল বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।



banner close
banner close