বুধবার

৮ জুলাই, ২০২৬ ২৪ আষাঢ়, ১৪৩৩

তদবির-ঘুসে ঋণ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৬১% খেলাপি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০

শেয়ার

তদবির-ঘুসে ঋণ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৬১% খেলাপি
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

রাজনৈতিক তদবির, ঘুসের বিনিময়ে ঋণ বিতরণ, নিয়োগে অনিয়ম এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এখন গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে। ব্যাংকটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২ জুলাই পর্যন্ত বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৬১ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও সামনে এসেছে।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১২২টি শাখার অধিকাংশের খেলাপি ঋণের হার ৭০ শতাংশের বেশি। গত ২ জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩ হাজার ২২৩ কোটি টাকা, যা ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭২ জন গ্রাহকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ায় খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটি নিট ৯৮ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে।

এদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের রাঙ্গামাটি শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক দর্পণ চাকমার বিরুদ্ধে গ্রাহকের নামে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি, জমা দেওয়া ঋণের কিস্তি আত্মসাৎসহ বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে এসব অনিয়ম ধরা পড়ার পর তিনি পলাতক রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ব্যাংকটির নীতিনির্ধারণ, নিয়োগ এবং ঋণ বিতরণে নানা অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিএম কয়েস সামির সময় এসব নিয়োগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের প্রভাব ছিল বলেও বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠালগ্নের পরিচালক অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী জানিয়েছেন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে তিনি মাত্র ছয় মাসের মাথায় পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার ভাষ্য, নীতিমালা অনুমোদনের আগেই বাছবিচারহীনভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিপুলসংখ্যক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যা ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত করে।

২০১১ সালের ২০ এপ্রিল যাত্রা শুরু করা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ মূলধন এসেছে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে এবং বাকি ৫ শতাংশ দিয়েছে সরকার। বিদেশগামী কর্মীদের দেওয়া বাধ্যতামূলক কল্যাণ ফি থেকেই মূলধনের বড় অংশ গঠিত হয়েছে। ব্যাংকটির লক্ষ্য ছিল স্বল্প সুদে অভিবাসন ঋণ, বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন ঋণ এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্স সেবাকে সহজ করা। তবে দেড় দশক পরও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ব্যাংকের বিভিন্ন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতীতে রাজনৈতিক নেতাদের তদবিরে অনেক ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যার বড় অংশ এখন আদায়যোগ্য নয়। পাশাপাশি ঘুসের বিনিময়ে বিতরণ করা অনেক ঋণেরও কোনো কার্যকর অনুসন্ধান নেই। আবার বিদেশে গিয়ে কাজ না পাওয়া কিংবা দ্রুত দেশে ফিরে আসা অনেক প্রবাসীও ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি।

বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগম বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ নীতিগত ছাড়ের মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হওয়ায় জুলাই থেকে খেলাপি ঋণের হার একবারে বেড়ে ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। তার দাবি, ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ছিল ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তিনি জানান, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পুনরায় নীতিগত ছাড়ের আবেদন করা হবে। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকটি ১৪০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করলেও সঞ্চিতি সংরক্ষণের কারণে নিট লোকসান হয়েছে।

খেলাপি ঋণের দিক থেকে বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ শাখা। ২০২৩ সালে চালু হওয়া এ শাখায় বিতরণ করা ৫২ কোটি ১৬ লাখ টাকার ঋণের মধ্যে ৪১ কোটি টাকাই খেলাপি, যা মোট ঋণের ৭৮ দশমিক ৮২ শতাংশ।

গোবিন্দগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক আরিফুল হক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশে বিভিন্ন ঋণ অনুমোদনের চাপ ছিল। পাশাপাশি জনবল সংকট, বিদেশ থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরা কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের ঋণ পরিশোধে অনীহাও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শাখা ব্যবস্থাপক অভিযোগ করেন, অতীতে কিছু ব্যবস্থাপক ঘুসের বিনিময়ে ঋণ অনুমোদন দিয়েছেন। তাদের দাবি, ২ লাখ টাকার ঋণের জন্য কোথাও কোথাও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুস নেওয়া হয়েছে। এছাড়া কমিশনের বিনিময়ে দালালচক্র গ্রাহক এনে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার পর অনেক ঋণগ্রহীতাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

২০১৮ সালে তফসিলভুক্ত ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সলিউশন না থাকায় এখনও অন্য ব্যাংকের প্রযুক্তিগত সহায়তায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তঃব্যাংক লেনদেন প্ল্যাটফর্মেও ব্যাংকটি এখনও যুক্ত হতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সব ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, তফসিলভুক্ত ব্যাংক হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে এখন অন্য ব্যাংকের মতোই খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।



banner close
banner close