মঙ্গলবার

৭ জুলাই, ২০২৬ ২৩ আষাঢ়, ১৪৩৩

খেলাপি ঋণ কিনবে বিশেষ কোম্পানি, আসছে নতুন আইন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ জুলাই, ২০২৬ ১১:৩০

শেয়ার

খেলাপি ঋণ কিনবে বিশেষ কোম্পানি, আসছে নতুন আইন
ছবি সংগৃহীত

ব্যাংক খাতের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ কমাতে সরকার ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (ডিএএমসি) গঠন করা হবে, যা ব্যাংকের খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ কিনে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের কাজ করবে।

খসড়া আইন অনুযায়ী, ডিএএমসি খেলাপি ঋণ ক্রয়, পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল, জামানত দখল, সম্পদ বিক্রি, আদালতে মামলা পরিচালনা এবং প্রয়োজন হলে ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করতে পারবে। এছাড়া রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, আধুনিকায়ন এবং নতুন বিনিয়োগের ব্যবস্থাও করতে পারবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় আইনটির খসড়া প্রস্তুত করেছে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন তহবিলের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বতন্ত্র ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট (ডিএমইউ) গঠন করা হবে, যা ডিএএমসিগুলোকে লাইসেন্স ও তদারকি করবে। পাশাপাশি খেলাপি সম্পদ দ্রুত উদ্ধার ও বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি দিতে বাধ্য করার বিধানও রাখা হয়েছে।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, বর্তমানে খেলাপি, অবলোপন করা ও নন-পারফর্মিং ঋণ পুনরুদ্ধার বা বিক্রির জন্য কোনো সমন্বিত আইন নেই। ফলে ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ আটকে থাকছে, যা নতুন ঋণ বিতরণ ও আর্থিক খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। নতুন আইন কার্যকর হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে এসব সম্পদ বিক্রি, পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।

অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী বলেন, আইনটি বাস্তবায়নে খেলাপি সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা গেলে ব্যাংকের ব্যালান্সশিট থেকে বিপুল খেলাপি ঋণ দ্রুত অপসারণ এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

খসড়া অনুযায়ী, ডিএমইউ প্রশাসনিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকলেও আইন প্রয়োগে স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা ভোগ করবে। এর প্রধানের পদমর্যাদা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সমান। তাঁকে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হবে। ব্যাংকিং, অর্থনীতি বা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হলে তিনি পদে থাকতে পারবেন না।

আইনে এক বা একাধিক ট্রাস্ট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। ব্যাংক থেকে কেনা খেলাপি সম্পদ ডিএএমসির নিজস্ব সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে না; বরং ট্রাস্টের নামে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে কোম্পানি দেউলিয়া হলেও ট্রাস্টের সম্পদের ওপর পাওনাদাররা দাবি করতে পারবেন না।

ডিএএমসি হিসেবে কাজ করতে হলে ডিএমইউর লাইসেন্স নিতে হবে। পাশাপাশি কোম্পানি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হবে এবং নির্ধারিত পরিশোধিত মূলধন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, অভিজ্ঞ পরিচালনা পর্ষদ ও ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ সদস্য স্বাধীন পরিচালক হতে হবে এবং তারা কোম্পানির মালিকানা বা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আর্থিক স্বার্থে যুক্ত থাকতে পারবেন না।

অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, প্রতারণা বা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তদন্তের পর ডিএএমসির লাইসেন্স বাতিল করা হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করার সুযোগ থাকবে।

ডিএএমসি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণ গ্রহণ, শেয়ার ও বন্ড ইস্যু, যৌথ বিনিয়োগ, সিকিউরিটাইজেশন এবং বিদেশি বিনিয়োগ। তবে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি ঋণ বা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারকে আরও পেশাদার করতে লোন সার্ভিসিং কোম্পানি (এলএসসি) গঠনেরও প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতার সঙ্গে আলোচনা, পুনঃতফসিল, সম্পদ অনুসন্ধান, তথ্য বিশ্লেষণ, আদালতসংক্রান্ত সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ঋণ পুনরুদ্ধারের কাজ করবে। তবে তারা নিজ নামে মামলা করতে, জনগণের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করতে বা জবরদস্তিমূলক কিংবা বেআইনি উপায়ে ঋণ আদায় করতে পারবে না।



banner close
banner close