মঙ্গলবার

৭ জুলাই, ২০২৬ ২৩ আষাঢ়, ১৪৩৩

মার্কিন শুল্ক প্রস্তাবে রফতানি উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ জুলাই, ২০২৬ ০৯:২২

শেয়ার

মার্কিন শুল্ক প্রস্তাবে রফতানি উদ্বেগ
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামালের আমদানি প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগের ভিত্তিতে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে এটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা চাপে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্রস্তাবিত শুল্ক নিয়ে প্রকাশ্য শুনানি করবে ইউএসটিআর। এর আগে সোমবার (৬ জুলাই) পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশ, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের লিখিত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। শুনানিতে উপস্থাপিত তথ্য, লিখিত মতামত ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনার পর তদন্তের ভিত্তিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইউএসটিআরের এই প্রকাশ্য শুনানিতে বাংলাদেশ সরকার অংশ নিচ্ছে না। সরকারের অবস্থান হলো, প্রকাশ্য শুনানির পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টির সমাধান করা হবে।

তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ না থাকায় শুনানিতে অংশ নিয়ে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দেশের অবস্থান তুলে ধরা হলে তা ইতিবাচক বার্তা দিত এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের যুক্তি আরও শক্তিশালীভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হতো।

গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। ইউএসটিআরের অভিযোগ, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামালের আমদানি নিষিদ্ধ করতে কিংবা কার্যকরভাবে সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এর ফলে মার্কিন শ্রমিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব দেশ আংশিক বা পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তাদের ওপর ১০ শতাংশ এবং যেসব দেশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, তাদের ওপর সাড়ে ১২ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। দেশভিত্তিক চূড়ান্ত শুল্কহার এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার এবং তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা শুরু থেকেই এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি কোনো পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি করে না। তৈরি পোশাক শিল্পসহ দেশের কোনো রফতানিমুখী খাতেই জোরপূর্বক শ্রমের চর্চা নেই। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বিভিন্ন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের কঠোর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিশ্বের অন্যতম নজরদারির আওতায় থাকা শিল্প।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে যে, দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বা অন্য কোনো রফতানিমুখী খাতে জোরপূর্বক শ্রমের চর্চা নেই। আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড অনুসরণ করেই শিল্প পরিচালিত হচ্ছে। তাই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রতি ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র যথাযথভাবে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ। সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা, শ্রম আইন বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের বিষয়ে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ককে শুধু রাজস্ব আহরণের উপায় হিসেবে নয়, বাণিজ্য ও শিল্পনীতি বাস্তবায়নের কৌশলগত উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার করছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে কোনো দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে শুধু বাণিজ্য ঘাটতি নয়, শ্রম অধিকার, পরিবেশ, শিল্প সক্ষমতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো বিষয়ও গুরুত্ব পাবে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার। অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ভিয়েতনাম, ভারত, মেক্সিকো কিংবা মধ্য আমেরিকার বিকল্প সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এতে নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি রফতানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগও প্রভাবিত হতে পারে।

জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুর পাশাপাশি বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে স্ট্রাকচারাল এক্সেস ক্যাপাসিটি বা অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিয়েও পৃথক তদন্ত করছে ইউএসটিআর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট শিল্পকে এই তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্ববাজারে মূল্য বিকৃতি তৈরি করছে। তবে বাংলাদেশের দাবি, শিল্প সম্প্রসারণ হয়েছে বৈশ্বিক চাহিদা ও বেসরকারি বিনিয়োগের কারণে, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির কারণে নয়।



banner close
banner close