বৃহস্পতিবার

২ জুলাই, ২০২৬ ১৮ আষাঢ়, ১৪৩৩

ঋণখেলাপি থেকে বাঁচাতে সিটি গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ জুলাই, ২০২৬ ১২:২০

শেয়ার

ঋণখেলাপি থেকে বাঁচাতে সিটি গ্রুপকে বিশেষ সুবিধা
ছবি সংগৃহীত

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করতে বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রুপটির ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি দায় থাকলেও আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের বর্তমান ঋণমান বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেশের ৩৭টি ব্যাংকে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সিটি গ্রুপের ঋণের বর্তমান শ্রেণিকৃত মান আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখা যাবে। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্রেণিকরণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রকৃত আয় ছাড়া ঋণ হিসাবে আরোপিত সুদ আয় খাতে নেওয়া যাবে না বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিটি গ্রুপ গত ৩১ মার্চ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে ঋণ শ্রেণিকরণ স্থগিত রাখাসহ সাত ধরনের নীতি সহায়তা চেয়ে আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) থেকেও একই দাবি জানানো হয়। সিটি গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চার বছর ধরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি তীব্র আর্থিক ও পরিচালনাগত চাপের মুখে পড়েছে। ফলে তাদের নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

আবেদনে সিটি গ্রুপ উল্লেখ করেছে, তারা দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ, চিনির ৪০ শতাংশ এবং আটার প্রায় ২৫ শতাংশ সরবরাহ করে। বছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জনকারী এই গ্রুপে ২৫ হাজার কর্মী কাজ করছেন। গত চার বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার ৪২ শতাংশ অবমূল্যায়নের ফলে প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এছাড়া টাকার নির্ধারিত ঋণসীমার কার্যকর ডলারমূল্য প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার কমে যাওয়ায় কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ‘হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে’ বিশাল বিনিয়োগকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এখানে ছয়টি বৃহৎ শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হলেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। উৎপাদনে যেতে না পারায় ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে গ্রুপটি চাপের মুখে পড়েছে। এছাড়া দেশীয় ঋণের সুদের হার ৪-৫ শতাংশ এবং ডলারের ঋণের সুদ ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে পৌঁছানোকেও সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন, তিন মাস ঋণ খেলাপি না করার আইনি সুযোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে তাৎক্ষণিক চাপ মোকাবিলার সময় পাওয়া যাবে। তবে সিটি গ্রুপের টেকসই পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে তাদের উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার ওপর। বর্তমানে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি গ্রুপটির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

সিটি গ্রুপের ঋণের তথ্যে দেখা যায়, ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের মোট ঋণের পরিমাণ ২৪ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ব্যাংক এইচএসবিসির দুই হাজার ২৫৫ কোটি এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের দুই হাজার ৫১ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। দেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংক এক হাজার ১৪০ কোটি, ইউসিবি এক হাজার ১৬৭ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক এক হাজার ১৫৮ কোটি, পূবালী এক হাজার ১৪৫ কোটি এবং প্রাইম ব্যাংক এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এছাড়া আরও বেশ কিছু ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ রয়েছে এই গ্রুপে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গ্রুপটিকে নীতি সহায়তা না দিলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেত এবং বিপুল পরিমাণ প্রভিশন রাখতে হতো। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোই মূলত নীতি সহায়তার পক্ষে তোড়জোড় শুরু করে। মুদ্রানীতি অনুষ্ঠানে সিটি গ্রুপ প্রসঙ্গে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, এ সংকট সমাধানে কাজ চলছে। তিনটি শীর্ষ ব্যাংকের এমডিকে নিয়ে সমাধানের পথ বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।



banner close
banner close