মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সত্ত্বেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় নতুন রেকর্ড গড়েছে। গত ২৭ জুন পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩৫ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবাহে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়ে বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ৩১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে একই সময়ে দেশের পণ্য রপ্তানিতে দেখা দিয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় আড়াই শতাংশ কমে ৪৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। এর প্রভাবে কোথাও কোথাও শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনাও ঘটছে।
অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীদের মতে, নতুন অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখা এবং রপ্তানি ঘুরে দাঁড়ানো অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিশ্ববাজারের চাহিদার ওপর। ইরান সংকটের অবসান হলে প্রবাসী আয় আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পেলে রপ্তানিও পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ জুন মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের জুন শেষে বেড়ে ৩৬ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তুলনামূলক ধীরগতির কারণে আমদানি প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়তা মিলেছে। তবে ইরান সংকটের কারণে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করায় রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবণতা বজায় রয়েছে। গত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস প্রতি মাসেই ৩ বিলিয়নের বেশি ডলার দেশে এসেছে। বিদায়ী অর্থবছরে মোট প্রবাসী আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, হুন্ডির ব্যবহার কমে যাওয়া, বৈধ ও অবৈধ বাজারে ডলারের দামের ব্যবধান সংকুচিত হওয়া এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠানো সহজ হওয়ায় প্রবাসী আয় বেড়েছে। এই ধারা ধরে রাখতে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে মোট ৪৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ সময়ে কেবল জুলাই, জানুয়ারি, এপ্রিল ও মে মাসে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি হলেও বাকি মাসগুলোতে তা ৪ বিলিয়নের নিচে ছিল।
রপ্তানিকারকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক, ইউরোপীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, বিশ্ববাজারে বর্তমানে মন্দাভাব বিরাজ করছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে চীনের আগ্রাসী বিপণনের কারণে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, বাজার ধরে রাখতে সরকার ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত কৌশল গ্রহণ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পণ্যের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন:








