বৃহস্পতিবার

২ জুলাই, ২০২৬ ১৮ আষাঢ়, ১৪৩৩

লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংকট নিরসনে ২৬৭৮১ কোটি টাকার প্রকল্প রেলওয়ের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৩৫

আপডেট: ২ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৩৬

শেয়ার

লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংকট নিরসনে ২৬৭৮১ কোটি টাকার প্রকল্প রেলওয়ের
ছবি সংগৃহীত

লোকোমোটিভ ও যাত্রীবাহী কোচের (ক্যারেজ) তীব্র সংকট এবং জনবল স্বল্পতার কারণে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬০০ ট্রেন বাতিল বা আংশিক বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহ এবং কারখানা আধুনিকায়নে মোট ২৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে একাধিক প্রকল্প হাতে নিচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রেন চলাচলের সূচি থাকলেও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জনবলসংকট ও যান্ত্রিক অচলাবস্থার কারণে পরিষেবা মারাত্মক সংকটে পড়েছে। ২০২০ সাল থেকে লোকোমোটিভ ও জনবল সংকটের কারণে ধারাবাহিকভাবে ১৬টি মেইল ও কমিউটার এবং ছয়টি লোকাল ট্রেন স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে সাধারণ যাত্রী ও নিম্ন আয়ের মানুষ সড়কপথে যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছেন, যার ফলে সড়কপথে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে।

রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ট্রেন সংকটের কারণে আন্তনগর ট্রেনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং স্থানীয়দের চাপে আন্তনগর ট্রেনগুলোকে অনিয়মিতভাবে বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রাবিরতি দিতে হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘপথের যাত্রীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। পূর্বাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৬২টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের ৬৯ শতাংশ এবং ১ হাজার ২৬৭টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচের ৪৩ শতাংশ অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে।

সংকট মোকাবিলায় চীন, দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়নে একাধিক প্রকল্প নিয়েছে রেলওয়ে। চীনের অনুদানে ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪৪ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সহায়তা বাবদ ১ হাজার ৫৯১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

আরেকটি প্রকল্পে ২০০টি মিটারগেজ ক্যারেজ, দুটি ব্রডগেজ ও দুটি মিটারগেজ রিলিফ ক্রেন এবং চারটি আন্ডারফ্লোর হুইল লেদ কেনা হবে, যাতে প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ২৪২ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা ঋণসহায়তা দেবে এডিবি। এ ছাড়া ৩ হাজার ৯৭০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যার ১৫৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং বাকি ২ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ তহবিল থেকে ঋণসহায়তা হিসেবে মিলবে। এই প্রকল্পের আওতায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্লিপার কার, চেয়ার কার, শোভন চেয়ার কার, খাবার গাড়ি ও পাওয়ার কার কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর একটি প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা, যাতে এআইআইবি ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা ঋণসহায়তা দেবে। সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপ আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে ৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুরে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় (কেলোকা) জেনারেল ওভারহোলিং স্টেশন স্থাপনে ৩ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যাতে যথাক্রমে ৩ হাজার ২৬৪ কোটি ও ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা ঋণসহায়তা চাইবে রেলওয়ে।

এ ছাড়া ৬৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ৫১২ কোটি টাকা অনুদান দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ৩ হাজার ৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ কেনার প্রকল্পে চীন বা দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা ঋণসহায়তা প্রত্যাশা করছে সরকার। আরেকটি প্রকল্পে ২ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৬০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ কেনা হবে, যাতে দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ তহবিল থেকে ১ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা ঋণসহায়তা মিলবে। ইডিসিএফ অর্থায়নে আরও ৩০০ মিটারগেজ ক্যারেজ আনার পরিকল্পনাও রয়েছে রেলওয়ের।

রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন জানান, এ বছর এডিবির অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং এআইআইবির অর্থায়নে ২০০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ কেনার পরিকল্পনাও সম্পন্ন হয়েছে। চলতি মাসে ২০টি ক্যারেজ দেশে পৌঁছাবে বলে প্রত্যাশা করছে রেলওয়ে।

রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তর প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় ২০৫০ সালের আগে পুরো রেল নেটওয়ার্ক রূপান্তর সম্ভব নয়। ফকির মো. মহিউদ্দিন জানান, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ প্রধান করিডরগুলোর অনেক অংশ এখনো মিটারগেজে রয়েছে এবং টঙ্গী থেকে আখাউড়াসহ বিভিন্ন রুট ডুয়েল বা ব্রডগেজে রূপান্তর করতে আগামী অন্তত ১০ বছর সময় প্রয়োজন। ততদিন পর্যন্ত মিটারগেজ লোকোমোটিভের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, রেলওয়েতে প্রতিদিন ১১০টি লোকোমোটিভ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে আছে মাত্র ৭০টির মতো, যার একটি বড় অংশ পুরোনো। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার দ্রুত লোকোমোটিভ সংগ্রহের ওপর জোর দিয়েছে বলে তিনি জানান। চীনের কাছ থেকে ২০টি লোকোমোটিভ অনুদান হিসেবে পাওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, এই অনুদান পাওয়া গেলে লোকোমোটিভ সংকট দ্রুত কাটবে এবং চীন বিনা মূল্যে সরবরাহের পাশাপাশি পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণ করলে তা সুবিধাজনক হবে। ভবিষ্যতে লোকোমোটিভ কেনার ক্ষেত্রে রেলওয়ে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল নয় বলে জানিয়ে তিনি বলেন, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যোগ্য ও সাশ্রয়ী সরবরাহকারীর কাছ থেকেই রোলিং স্টক সংগ্রহ করা হবে।



banner close
banner close