রবিবার

২৮ জুন, ২০২৬ ১৪ আষাঢ়, ১৪৩৩

ক্যামেলস রেটিং বাতিল, চালু হচ্ছে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬ ১২:১৫

শেয়ার

ক্যামেলস রেটিং বাতিল, চালু হচ্ছে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি
ছবি সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্য মূল্যায়নের দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতি ক্যামেলস রেটিং ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। এখন থেকে ব্যাংকগুলোর সার্বিক ঝুঁকি ও ব্যবস্থাপনা মূল্যায়নে কম্পোজিট রিস্ক রেটিং (সিআরআর) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। নতুন এই ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিস্ক বেসড সুপারভিশন বা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামোর একটি অংশ।

এতদিন ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগত মান, ব্যবস্থাপনা, আয়, তারল্য এবং বাজার ঝুঁকির সংবেদনশীলতা—এই ছয়টি সূচকে একটি ব্যাংকের অতীত ও বর্তমান আর্থিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ক্যামেলস রেটিং করা হতো। ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত এই পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলোকে এক থেকে পাঁচ পর্যন্ত স্কোর দেওয়া হতো। এর মধ্যে এক মানে সবচেয়ে ভালো এবং পাঁচ মানে সবচেয়ে দুর্বল ব্যাংক হিসেবে গণ্য করা হতো। এই রেটিংয়ের ফলাফল পুরোপুরি গোপন রাখা হতো এবং কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীকে তা জানানো হতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যামেলস পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এটি মূলত অতীতভিত্তিক বা ব্যাকওয়ার্ড লুকিং মূল্যায়ন ব্যবস্থা। কোনো ব্যাংক বিগত তিন বা ছয় মাসে কেমন ব্যবসা করেছে বা তাদের আর্থিক প্রতিবেদনের অবস্থা কী ছিল, তার ওপর ভিত্তি করে রেটিং দেওয়া হতো। ফলে ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক সংকটে পড়ার ঝুঁকি থাকলেও তা আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হতো না। এর পরিবর্তে চালু হওয়া সিআরআর পদ্ধতি হবে ভবিষ্যৎমুখী বা ফরওয়ার্ড লুকিং। এটি শুধু ব্যাংকের বর্তমান অবস্থাই মূল্যায়ন করবে না, বরং ভবিষ্যতে কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকটির পর্যাপ্ত সক্ষমতা আছে কি না, তা-ও আগাম মূল্যায়ন করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্যামেলস ও অন্যান্য সমান্তরাল রেটিং ব্যবস্থা একসঙ্গে চালু থাকলে কাজের পুনরাবৃত্তি হয় এবং তদারকি কর্মকর্তাদের সময় অপচয় ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে দুই পদ্ধতির ফলাফলে অমিল হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই তদারকি প্রক্রিয়াকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করতে ক্যামেলস রেটিং বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে এ ধরনের ঝুঁকিভিত্তিক রেটিং ব্যবস্থা চালু করেছে।

নতুন এই তদারকি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্গঠন করা হয়েছে। তদারকি ও অভিযোগ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করে ১৭টি নতুন ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ গঠন করা হয়েছে এবং আগের কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সিআরআর ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো ব্যাংকে বড় সংকট তৈরির আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা যাবে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। এতে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে।

তবে ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই কাঠামোর সাফল্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করার সদিচ্ছার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। অতীতে অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণ লুকিয়ে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন না রেখেও তদারকি সূচকগুলোয় কৃত্রিমভাবে ভালো ফলাফল দেখাত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব কারসাজির বিষয়ে জেনেও অনেক ক্ষেত্রে নীরব ছিল এবং কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। এছাড়া বারবার প্রভিশন ও মূলধন সংরক্ষণের শর্ত শিথিল করা এবং নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার মতো নীতিগত ছাড়ের কারণে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোও নিজেদের ভালো হিসেবে জাহির করার সুযোগ পেত।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকিং খাতের এই দুর্বলতাগুলো আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা দেশের মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান। নতুন এই ভবিষ্যৎমুখী মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



banner close
banner close