বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) নিয়ে দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। চুক্তির বিভিন্ন ধারা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কৃষি খাতকে ঘিরে, কারণ চুক্তির অন্যতম প্রধান অংশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা এবং মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজার আরও উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
চুক্তিটি গত ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে তখনকার বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী, উভয় পক্ষের নিজ নিজ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি লিখিতভাবে জানানোর ৬০ দিন পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার কথা। তবে এখন পর্যন্ত এই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় চুক্তিটি কার্যকর হয়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ২০ ফেব্রুয়ারি দেশটির সাধারণ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করলেও বাংলাদেশের সঙ্গে করা এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি তার বাইরে রয়ে গেছে। চুক্তি কার্যকর না হলেও এর আলোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল, ভুট্টা ও তুলাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য আমদান শুরু করেছে বাংলাদেশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে কিছু শিল্প খাত কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৃষক, খামারি ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিনীতি ও কৃষিবাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে প্রতিবছর প্রায় ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের জন্য প্রতিবছর অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম এবং সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য, পাশাপাশি তুলা, ভুট্টা ও পশুখাদ্য। এতদিন এসব পণ্যের বড় অংশ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে আমদানি করা হতো। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজার পরিস্থিতি বা মূল্য যাই হোক না কেন, নির্ধারিত পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির এই বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের আমদানি নীতির নমনীয়তা কমিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি খাত এখনও মূলত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকনির্ভর। দেশের দেড় কোটির বেশি কৃষক পরিবার সীমিত জমি ও সীমিত পুঁজি নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ব্যবস্থা ব্যাপক ভর্তুকি, আধুনিক প্রযুক্তি, বৃহৎ খামার ও উচ্চ উৎপাদনশীলতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, ফলে মার্কিন কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম। শুল্ক কমে গেলে বা উঠে গেলে এসব পণ্য বাংলাদেশের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে প্রবেশ করতে পারবে। কৃষি-অর্থনীতিবিদদের মতে, এতে স্থানীয় কৃষকরা মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। বিশেষ করে ভুট্টা, গম, সয়াবিন ও পশুখাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও নীতিগত স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগের কারণ। তিনি বলেন, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাজার আরও উন্মুক্ত হলে দেশীয় কৃষক ও খামারিরা বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন। তিনি কৃষি খাত, খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বল্পোন্নত দেশ পরবর্তী উত্তরণের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বর্তমানে দেশে ভুট্টা চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে মূলত পোলট্রি ও মৎস্য খাতের চাহিদার কারণে। কিন্তু বিপুল পরিমাণে তুলনামূলক সস্তা মার্কিন ভুট্টা বাজারে এলে দেশীয় উৎপাদকদের উৎপাদন ব্যয় উঠে আসা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
চুক্তির ফলে পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাত কিছু সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, কারণ পশুখাদ্যের অন্যতম প্রধান উপাদান সয়াবিন মিল, ডিডিজিএস, ভুট্টা ও অন্যান্য কাঁচামাল সহজলভ্য হতে পারে। এতে খাদ্য উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমতে পারে এবং খামারিরা উপকৃত হতে পারেন। তবে এই সুবিধা শেষ পর্যন্ত কতটা ভোক্তা বা উৎপাদক পর্যায়ে পৌঁছাবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় কৃষকরা উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ সংকট দেখা দিলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ গত দুই দশকে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধান উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি ভুট্টা, শাকসবজি, মাছ, পোলট্রি ও ডিম উৎপাদনেও বড় সাফল্য এসেছে। কিন্তু কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আমদানিনির্ভরতার প্রবণতা বাড়লে এই অর্জনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে। তাদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা শুধু খাদ্য আমদানি করতে পারার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকরা উৎপাদনে আগ্রহ হারালে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কৃষি বায়োটেকনোলজি ও খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড সম্পর্কিত। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মানদণ্ড এবং খাদ্য নিরাপত্তা সনদকে বাংলাদেশকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে, যার ফলে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বা জিএম ফসল ও খাদ্যপণ্যের বাজার প্রবেশ সহজ হতে পারে। কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, আধুনিক কৃষিতে বায়োটেকনোলজির ব্যবহার বিশ্বজুড়ে বাড়ছে, তবে ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার, লেবেলিং ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। বাংলাদেশে জিএম খাদ্য নিয়ে জনমত এখনও বিভক্ত, ফলে এই খাতে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষকের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চুক্তির প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশে ভোজ্যতেল, পশুখাদ্য, বীজ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিযন্ত্র খাতে স্থানীয় বিনিয়োগ ক্রমে বাড়ছে। শুল্ক কমে যাওয়ার ফলে মার্কিন পণ্য সহজে বাজারে প্রবেশ করলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ও মূলধনের দিক থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলো অনেক শক্তিশালী হওয়ায় সমান সুযোগ দেওয়া হলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার অংশীদারিত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
চুক্তির সব দিক নেতিবাচক নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তুলা আমদানিতে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, যাতে পোশাক খাতের উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এছাড়া উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, বীজ, গবেষণা সহযোগিতা, কৃষি যন্ত্রপাতি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগও বাড়তে পারে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যথাযথ নীতি সহায়তা দিলে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির মূল প্রশ্ন হলো কৃষকের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে। বাংলাদেশের কৃষি খাত শুধু অর্থনীতির একটি খাত নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সুরক্ষামূলক নীতি অব্যাহত রাখা না গেলে এই চুক্তির সুবিধার চেয়ে ঝুঁকিই বেশি হয়ে উঠতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির আলোচনার সময় প্রাণিসম্পদ খাতের স্বার্থ বিবেচনায় কিছু শর্তের বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি সহজ হলে দেশের লাখ লাখ খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। বাংলাদেশের গরু-ছাগল পালন ও মাংস উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি দুই কোটির বেশি মানুষ জড়িত বলে জানিয়ে তিনি বলেন, তুলনামূলক কম দামে মার্কিন মাংস বাজারে প্রবেশ করলে দেশীয় খামারিরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন এবং স্থানীয় বাজারে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে।
ফরিদা আখতার আরও বলেন, আমদানিকৃত প্রাণিজ পণ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাণীর সংক্রামক ও জুনোটিক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে বাংলাদেশকে নিজস্ব পরীক্ষার সুযোগ রাখতে হবে, কিন্তু চুক্তির কিছু শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের মান ও পরীক্ষাকে চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণের বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর মতে, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে বাজার উন্মুক্ত করা হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন, খামারি ও খাদ্য নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের দ্বার খুলে দিয়েছে। এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে সরকার কীভাবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করে, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুযোগকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে তার ওপর।
আরও পড়ুন:








