সোমবার

২২ জুন, ২০২৬ ৯ আষাঢ়, ১৪৩৩

অদক্ষতার মাশুলেই বাড়ছে বন্দরের আয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ জুন, ২০২৬ ১২:২৩

শেয়ার

অদক্ষতার মাশুলেই বাড়ছে বন্দরের আয়
ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব কাঠামোর বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যে সূচককে বন্দরের অদক্ষতার প্রতিফলন হিসেবে ধরা হয়, সেই কনটেইনারের দীর্ঘ অবস্থানকালই এখন বন্দরের অন্যতম বড় আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। নতুন ট্যারিফ কার্যকরের পর প্রতি টিইইউ (টোয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার থেকে বন্দরের গড় আয় দাঁড়িয়েছে ১৫২ ডলার, যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে স্টোর রেন্ট বা কনটেইনার দীর্ঘ সময় বন্দরে পড়ে থাকার বিপরীতে আদায়কৃত চার্জ থেকে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি টিইইউ কনটেইনার থেকে স্টোর রেন্ট বাবদ গড়ে ৩৪ দশমিক ২৫ ডলার আয় হয়েছে, যা মোট পরিচালন রাজস্বের ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। ফলে বন্দরে কনটেইনার যত বেশি সময় অবস্থান করছে, স্টোর রেন্ট খাত থেকে বন্দরের আয়ও তত বাড়ছে।

অন্যদিকে, বন্দরের সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎস হিসেবে রয়েছে জাহাজে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম। এ খাত থেকে প্রতি টিইইউতে গড়ে ৭১ দশমিক ৬৮ ডলার আয় হয়েছে, যা মোট রাজস্বের ৪৭ শতাংশ। এছাড়া কুই গ্যান্ট্রি ক্রেন (কিউজিসি) চার্জ থেকে গড়ে ১৭ দশমিক ৯১ ডলার এবং লিফট অন-লিফট অফ কার্যক্রম থেকে ৯ দশমিক ৪৩ ডলার আয় হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টোর রেন্ট থেকে উচ্চ আয় কোনোভাবেই ইতিবাচক সূচক নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলমের মতে, এটি বন্দর ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতার প্রতিফলন। তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে একটি কনটেইনার বন্দরে পৌঁছানোর তিন দিনের মধ্যে খালাস হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা এক সপ্তাহের বেশি সময় অবস্থান করে। এর পেছনে কাস্টমস প্রক্রিয়ার বিলম্ব, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং কিছু আমদানিকারকের কম খরচে পণ্য সংরক্ষণের সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা কাজ করছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনারের গড় অবস্থানকাল প্রায় সাড়ে নয় দিন। বন্দর কর্মকর্তাদের উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, এই সময়ের বড় অংশ ব্যয় হয় কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সসহ সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতায়। প্রি-অ্যাসেসমেন্ট ব্যবস্থা ও গ্রিন চ্যানেলের সীমিত ব্যবহার, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং আমদানিকারকদের বিলম্বিত খালাস প্রক্রিয়া এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কনটেইনার খালাস হলে ইয়ার্ডে জায়গা খালি থাকে এবং বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়। তিনি জানান, অনেক সময় আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য ছাড় করাতে স্টোর রেন্ট বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বশেষ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নকারী জার্মান প্রতিষ্ঠান হামবুর্গ পোর্ট কনসালটিংয়ের বিশ্লেষণেও কনটেইনারের অবস্থানকাল কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, অবস্থানকাল কমানো গেলে একই অবকাঠামো ব্যবহার করেই বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ৩১ লাখ ৫০ হাজার টিইইউ হলেও বাস্তবে ৩৪ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

বাণিজ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা টার্মিনাল অপারেটরের সক্ষমতা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। কাস্টমস আধুনিকায়ন, পরীক্ষাগার সেবার গতি বৃদ্ধি, অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় এবং দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, একটি বন্দরের কার্যকারিতা নির্ধারিত হয় আমদানিকৃত পণ্য কত দ্রুত ব্যবসায়ীর হাতে পৌঁছায় তার ওপর। তাই অপারেশনাল দক্ষতার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও কাস্টমস প্রক্রিয়ার গতিশীলতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, বন্দর কোনো গুদামঘর নয়। পণ্যের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, বন্দরের ভেতরেই কনটেইনার খুলে পণ্য খালাসের প্রচলিত পদ্ধতি এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াগত বিলম্ব কনটেইনারের অবস্থানকাল বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বন্দরের সক্ষমতা ও সরবরাহ শৃঙ্খল উভয়ই চাপে পড়ছে।



banner close
banner close