দেশের ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫-এ এই তথ্য উঠে এসেছে। মূলধন পর্যাপ্ততা পরিস্থিতিও সংকটাপন্ন পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রভাবে ব্যাংক খাত ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের সম্মিলিত লোকসানের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতিকে অশনি সংকেত হিসেবে বর্ণনা করেছেন ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে। এ সংকটের জন্য তারা বাংলাদেশ ব্যাংককেও আংশিকভাবে দায়ী করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন উপায়ে ব্যাংক খাতে অর্থ লোপাট হয়েছে। আদায় না হওয়ায় এসব ঋণ পরবর্তীতে খেলাপি ঋণে রূপ নেয়। প্রকৃত চিত্র আড়াল করার জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত দুরবস্থা ক্রমান্বয়ে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে এবং সময়ের সঙ্গে সংকটের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়।
দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের মধ্যে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট অংশ খেলাপি, অবলোপন করা এবং আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণের সক্ষমতা হারিয়েছে ব্যাংক খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, যার প্রভাব পড়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মূলধনের ওপর।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু ব্যাংককে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে এবং এই সুবিধা না থাকলে অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো। তিনি আরও বলেন, বেশ কিছু ব্যাংকের ৩৫ শতাংশের বেশি সম্পদ থেকে কোনো আয় আসছে না, অর্থাৎ এই ব্যাংকগুলোর এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পদ অলাভজনক হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন আয় দিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে ব্যাংকের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংক খাতের আয় কমে যাওয়ায় গত বছর শেষে এ খাতের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এর আগের বছর, ২০২৪ সালে, ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার কারণে সংকট আরও বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকও কম দায়ী নয়। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার শ্রেণীকৃত ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের ছাড় দিচ্ছে এবং ডাউন পেমেন্টের হার কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যার ফলে ঋণ আদায়ে শৃঙ্খলা কমেছে এবং সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় বিশ্বের অনেক বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণসুবিধা বন্ধ করে দিচ্ছে এবং এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ব্যাংকগুলোর এলসি গ্রহণেও অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর করপোরেট গভর্ন্যান্স আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, অতীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেশাদারিত্বে ঘাটতি ছিল এবং প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরেও সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল, যা ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নের সময় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূলধন ঘাটতির বিষয়টি ব্যাংকিং খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রক্ষণশীল নীতির কারণে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে বলে তারা মন্তব্য করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কয়েকটি ব্যাংকের সম্পদের মান উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হওয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর পড়ছে, যার কারণে খাতটির সামগ্রিক অবস্থা দুর্বল মনে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে অনেক ব্যাংক এখনও সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে এবং বেসরকারি খাতের ঋণচাহিদা পূরণের সক্ষমতা এসব ব্যাংকের রয়েছে।
আরও পড়ুন:








