বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হলেও সেই প্রবৃদ্ধি অনুপাতে কর-রাজস্বে রূপান্তরিত হচ্ছে না। প্রতি বছর উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আদায়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ ও সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যর্থতা সাময়িক নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সমস্যার প্রতিফলন।
সংকীর্ণ করভিত্তি
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে ৬.২ থেকে ৭.৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন পর্যায়ের মধ্যে অন্যতম। অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতে পরিচালিত হওয়ায় বিপুল পরিমাণ আয় ও লেনদেন কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজের মতে, শুধু অনানুষ্ঠানিক খাতই নয়, আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির মধ্যেও কর পরিপালনের হার কম। অনেক টিনধারী নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন না, আর নিয়মিত করদাতার সংখ্যা আরও সীমিত।
করদাতাদের আস্থাহীনতা ও হয়রানির আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর ফাঁকির পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়, প্রশাসনিক আচরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। করদাতাদের একটি বড় অংশের ধারণা, নিয়ম মেনে কর দিলেও তারা অতিরিক্ত নজরদারি, হয়রানি কিংবা জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারেন।
ফলে স্বেচ্ছায় কর পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পরিবর্তে কর এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, যা রাজস্ব সংগ্রহকে আরও দুর্বল করে।
অতিরিক্ত কর অব্যাহতি
বিনিয়োগ উৎসাহিত করা ও নির্দিষ্ট শিল্পখাতকে সহায়তা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে ভ্যাট ও কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে সময়সীমাহীন ও অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে।
মাসরুর রিয়াজের ভাষ্য অনুযায়ী, কর অব্যাহতি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা করের ভিত্তি সংকুচিত করেছে। এর ফলে যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপরই তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
তথ্যভিত্তিক কর ব্যবস্থার ঘাটতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শাহাদাত সিদ্দিকীর মতে, রাষ্ট্র যে অর্থনীতির ওপর কর আরোপ করতে চায়, সেই অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তার কাছে নেই।
ভ্যাট ব্যবস্থার মাধ্যমে অধিকাংশ লেনদেন নথিভুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বিপুলসংখ্যক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসাবের বাইরে থেকে যায়। ফলে আয়, সম্পদ ও মালিকানার বড় একটি অংশ কর প্রশাসনের নজরের বাইরে রয়ে যায়।
এর ফলে অর্থনীতিতে এক ধরনের “কাঠামোগত অদৃশ্যতা” তৈরি হয়েছে, যেখানে সম্পদ ও লেনদেন বাস্তবে থাকলেও রাষ্ট্রের কর মানচিত্রে তার কোনো প্রতিফলন নেই।
সমন্বিত ডেটাবেজের অভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার, সম্পদ, ব্যবসা ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য বিভিন্ন সংস্থার কাছে বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে কার্যকর সংযোগ না থাকায় কর ফাঁকি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্নেহাশিষ বড়ুয়ার মতে, ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক বিভাগের তথ্য একীভূত করা গেলে অসঙ্গতি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। করের আওতা বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা জরুরি।
দুর্বল আইন প্রয়োগ ও বৈষম্য
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদের মতে, সমস্যা কেবল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে নয়, বরং বাস্তবায়নে। তিনি মনে করেন, যারা নিয়মিত কর দেন, তারাই অনেক সময় বেশি নজরদারির মুখে পড়েন; অন্যদিকে প্রভাবশালী কর ফাঁকিদাতারা নানা উপায়ে পার পেয়ে যান।
এ ছাড়া করসংক্রান্ত মামলাগুলো দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আটকে থাকে, যা সরকারের রাজস্ব সংগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের ধীরগতি
এনবিআরের সাবেক সদস্য (ভ্যাট নীতি) ফরিদ উদ্দিনের মতে, বাংলাদেশের কর প্রশাসন এখনও অনেকাংশে কাগজনির্ভর ও বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি।
ফলে অর্থনীতিতে সৃষ্ট নতুন আয় ও লেনদেনকে দ্রুত কর নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন ছাড়া রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের উন্নতি সম্ভব নয় বলেও তিনি মনে করেন।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
২০২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০২৬ অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শেষ প্রান্তিকে অস্বাভাবিক উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন, যা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের জন্য আরও উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন মত হলো, সমস্যার মূল সমাধান করের হার বৃদ্ধি নয়; বরং করভিত্তি সম্প্রসারণ, তথ্যভিত্তিক প্রশাসন, ডিজিটালাইজেশন, করদাতাবান্ধব পরিবেশ এবং ন্যায়সঙ্গত আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের রাজস্ব সংকট মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব নয়, বরং কর প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা, সীমিত করভিত্তি, তথ্যের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা এবং সুশাসনের সমস্যার ফল। অর্থনীতির প্রকৃত আকার ও কার্যক্রমকে সঠিকভাবে শনাক্ত করে ন্যায়সঙ্গত ও আধুনিক করব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে প্রতি বছর উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
আরও পড়ুন:








