সোমবার

৮ জুন, ২০২৬ ২৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ব্যাংক খাত সংস্কারে কমিশন গঠনের ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ জুন, ২০২৬ ১৫:০৪

শেয়ার

ব্যাংক খাত সংস্কারে কমিশন গঠনের ঘোষণা
ছবি সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, পরিবর্তন ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে খাতটিকে কমিশনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে রোববার আয়োজিত ব্যাংক খাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে। গণমাধ্যম ও দুর্নীতি দমন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যাংকিং খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও সংস্কারের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সামগ্রিক সুশাসন নিশ্চিত না হলে শুধু গণমাধ্যমের উপস্থিতির মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

বিগত সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তথ্য ও পারফরম্যান্স-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান বিকৃত করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ ধরনের তথ্য পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অর্থনীতির যে দ্বার উন্মোচন করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বেসরকারি খাতের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অর্থায়নের উৎস হিসেবে ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

সেমিনারে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক চাপে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ সুশাসনের ঘাটতি।

তিনি জানান, ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারি, ২০২১ সালে এর দ্বিতীয় ঢেউ, ২০২২ সালে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা এবং পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকিং খাত ধারাবাহিক চাপের মুখে পড়ে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ইউসিবির দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রতিষ্ঠানটিতে তারল্য সংকট ও উচ্চ খেলাপি ঋণের সমস্যা ছিল।

মামদুদুর রশীদ বলেন, সুশাসনের তিনটি মৌলিক উপাদান হলো জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনাকে জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে এবং প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব ও বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার করলে নৈতিক স্খলন ঘটে এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হয়।

তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালে ব্যাংকিং খাতে রিপোর্ট করা খেলাপি ঋণের হার ছিল ১১ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ২৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৩৫ শতাংশে পৌঁছায়। তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় প্রকৃত তথ্য প্রকাশের ফলে দীর্ঘদিনের বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে।

সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের অর্থনীতির অধিকাংশ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এখনও ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজার প্রত্যাশিত মাত্রায় বিকশিত না হওয়ায় ব্যাংক খাতের সুশাসনের সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশের ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। ২০১৯ সাল থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এ সংকট দৃশ্যমান হতে শুরু করে। ২০২১ সাল থেকে কয়েকটি ব্যাংকও আমানত ফেরত দিতে সমস্যায় পড়ে। বর্তমানে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকসহ অন্তত ১৪টি ব্যাংক চাহিদা অনুযায়ী আমানত ফেরত দিতে পারছে না বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

প্রবন্ধে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও বিধিবিধানের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের স্বাধীন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান জাহিদ এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। অনুষ্ঠানে সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি ওবায়দুল্লাহ রনি এবং প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার সানাউল্লাহ সাকিব মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।



banner close
banner close