দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৬ ভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়ে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটিতে পৌঁছেছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মন্দা, বিনিয়োগ স্থবিরতা, উচ্চ সুদের হার এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। একই সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে অনেক উদ্যোক্তা নিয়মিত ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। এর ফলে অনেক ঋণ খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদের হার, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চাপের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব ও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগামী দুই বছরের মধ্যে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, নির্বাচনের আগে নবায়ন করা অনেক ঋণ পরবর্তীতে পুনরায় খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। তাঁর মতে, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাবও পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গ্রাহকের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে, যা আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে অতীতে সংঘটিত অনিয়ম, জালিয়াতি ও ঋণ কেলেঙ্কারির প্রকৃত প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্চ শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় চার হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। তবে একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকে বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ খেলাপি। যদিও আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ খাতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ চার লাখ ১৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা, যা তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। এছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ তিন হাজার ২৬২ কোটি এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের বেশি সময়ে বিভিন্ন অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে বড় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী এবং কয়েকটি ব্যাংকে সংঘটিত আর্থিক অনিয়ম ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হলো ব্যবসা-বাণিজ্যে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং শিল্প খাতে উৎপাদন ও মুনাফা হ্রাস। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হওয়ায় তাদের পক্ষে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে।
আরও পড়ুন:








