পোশাক রপ্তানিতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার বাড়ানোর সরকারি প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পোশাক খাতে। সরকারের প্রস্তাবিত আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯ অনুযায়ী বিভিন্ন রপ্তানি খাতে নগদ প্রণোদনা ও শুল্ক সুবিধা পেতে ন্যূনতম মূল্য সংযোজনের হার বাড়ানো হচ্ছে। তবে শিল্পমালিকরা বলছেন, প্রস্তাবিত হার আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা এবং চলমান বাণিজ্য আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
খসড়া নীতিমালায় নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক রপ্তানিতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার বর্তমান ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রে এ হার ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া সিনথেটিক ফাইবারভিত্তিক অন্তর্বাস ও বিশেষায়িত পোশাকে ৪০ শতাংশ, জাহাজ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ এবং কাঠের আসবাবপত্রে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানসহ প্রধান বাজারগুলোতে রপ্তানি আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি এবং অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায় নতুন সমঝোতার প্রয়োজন হবে। নথিতে আরও বলা হয়, ভবিষ্যতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পেতে অনেক ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করতে হবে এবং ডাবল ট্রান্সফরমেশনসহ পণ্যভিত্তিক উৎপত্তি বিধিও মেনে চলতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে ডাবল ট্রান্সফরমেশন শর্ত পূরণ করতে হবে, যা কার্যত প্রায় ৪০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের সমতুল্য। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক অবস্থানেও কমপক্ষে ৪০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ কারণে কেবল ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের ভিত্তিতে প্রণোদনা নির্ধারণ করলে ভবিষ্যতে রপ্তানি সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, খসড়া নীতিতে নির্ধারিত ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের হার অনেক পণ্যের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবারনির্ভর উচ্চমূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে কাঁচামালের ব্যয় বেশি হওয়ায় এ হার অর্জন করা কঠিন হতে পারে। তিনি জানান, সমিতির পক্ষ থেকে মূল্য সংযোজনের সীমা ২০ শতাংশ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা না করলে নতুন পণ্য উন্নয়ন ও স্থানীয় শিল্পায়নের গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সমিতির নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্ক সংক্রান্ত নীতি নিয়ে আলোচনা চললেও আদালতের একটি রায়ের কারণে তা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে, ফলে এ মুহূর্তে সেটি বাংলাদেশের ওপর কার্যকর হচ্ছে না।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে নিটওয়্যার খাত তুলনামূলকভাবে বেশি স্থানীয় মূল্য সংযোজন করতে সক্ষম হলেও ওভেন খাত এখনো অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। ফলে নতুন বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ওভেন পোশাক খাত বেশি চাপে পড়তে পারে। এক শীর্ষ রপ্তানিকারক জানান, স্পোর্টসওয়্যার, ওয়েডিং ওয়্যার ও টেক-ওয়্যারের মতো নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা দেওয়া হলে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে সহায়তা মিলবে, কারণ এসব পণ্যের প্রাথমিক পর্যায়ে আমদানিকৃত কাপড় ও আনুষঙ্গিক উপকরণের ওপর নির্ভরতা বেশি থাকে।
খসড়া নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত মূল্য সংযোজনের হার অর্জনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকরা নগদ সহায়তা এবং আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক সুবিধা পাবেন না। চূড়ান্ত নীতিমালা প্রণয়নের আগে গত ২২ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শিল্পমালিক, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ মূল্য সংযোজনের হার, আমদানি নীতির বিধান এবং এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য কৌশল নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে হলে শুধু মূল্য সংযোজনের হার বাড়ানোই নয়, বরং স্থানীয় সুতা, কাপড় ও অন্যান্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আরও পড়ুন:








