সোমবার

১ জুন, ২০২৬ ১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১ জুন, ২০২৬ ০৮:১৬

শেয়ার

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পরিকল্পনা
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি খাতের চাপ মোকাবিলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রস্তুত করেছে সরকার। একই সঙ্গে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকছে।

অর্থ বিভাগের প্রস্তুত করা বাজেটের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটের আকার ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। শতাংশের হিসাবে এ বৃদ্ধি প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটটি উপস্থাপন করবেন। বাজেট প্রণয়নের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে এর মূল কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থিক খাতের সংস্কারসহ ১৩টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

সরকার আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি খাতে মূল্যবৃদ্ধির চাপের কারণে এসব লক্ষ্য অর্জন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

বাজেটের খসড়ায় তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে সমন্বয়ের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা বাবদ মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি, গ্যাসে ৬ হাজার ৫০০ কোটি এবং সারে ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাজেটের মোট ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় হিসেবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হিসেবে বাস্তবায়ন করা হবে।

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি, নন-এনবিআর উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি এবং করবহির্ভূত খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরের জন্য অনুমোদিত ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৪০০টির বেশি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন উপকারভোগীদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজেটে তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ নামে নতুন একটি ধারণা যুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, সাংস্কৃতিক শিল্প, উদ্ভাবনভিত্তিক ব্যবসা এবং স্টার্টআপ খাতে বিশেষ প্রণোদনা ও তহবিল গঠনের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণে ‘ডিরেগুলেশন’ বা নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ নীতিও গ্রহণের উদ্যোগ রয়েছে।

অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈদেশিক অর্থায়ন ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ঋণের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাসহ আটটি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, করের আওতা সম্প্রসারণ, এডিপি বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে ফিরিয়ে আনতে সরকার বাস্তবভিত্তিক সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কারই হবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



banner close
banner close