আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, করদাতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে কর ছাড়, বিনিয়োগ প্রণোদনা, স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ থাকতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে চিনিযুক্ত পানীয় ও খাদ্যপণ্যের ওপর ন্যূনতম টার্নওভার কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বিদ্যমান কর কাঠামোর কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর করহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের কর ছাড়ের বিরোধিতা করে বলছেন, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি মোকাবিলায় চিনিযুক্ত পণ্যের ওপর কর আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
করদাতাদের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে স্বয়ংক্রিয় কর রিফান্ড ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করেছে এনবিআর। নতুন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত কর পরিশোধকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আলাদা আবেদন ছাড়াই তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও করদাতাদের আস্থা বৃদ্ধি করবে।
স্বাস্থ্য খাতেও একাধিক কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে হৃদরোগীদের ব্যবহৃত করোনারি স্টেন্টের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার, ডায়ালাইসিস যন্ত্রপাতি আমদানিতে অগ্রিম কর প্রত্যাহার, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক কমানো এবং এপিআই খাতে বিনিয়োগে কর প্রণোদনার প্রস্তাব রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অন্যদিকে রাজস্ব আয় বাড়াতে তামাক ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সিগারেটের সব স্তরের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশীয়ভাবে উৎপাদিত মদের ওপর নির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি হলো বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদেশে থাকা অর্থ দেশে এনে উৎপাদনশীল শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে বিনিয়োগ করলে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না। তবে এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক করহারের তুলনায় বেশি কর আরোপ করা হতে পারে।
এ বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কঠোর ও স্বচ্ছ নীতিমালার আওতায় অতিরিক্ত কর আরোপ করে এ ধরনের উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আসন্ন বাজেটের আরেকটি বড় উদ্যোগ হতে পারে ‘লাইফ-সাইকেলভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা’। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গর্ভাবস্থা থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত একজন নাগরিককে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, মাতৃত্ব ভাতা, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষাবৃত্তির আওতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এবং অবশিষ্ট অংশ ২০২৭-২৮ অর্থবছরে কার্যকর করা হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেট বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্পোন্নয়নকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের চেষ্টা করবে। তবে পাচার হওয়া অর্থ বৈধ করার সুযোগ, চিনিযুক্ত পণ্যে কর কমানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকতে পারে। সব মিলিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন:








