বৃহস্পতিবার

২৮ মে, ২০২৬ ১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

চামড়া বাজারে মন্দা, লক্ষ্যমাত্রা কমেছে এক-তৃতীয়াংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮ মে, ২০২৬ ১৯:২৫

শেয়ার

চামড়া বাজারে মন্দা, লক্ষ্যমাত্রা কমেছে এক-তৃতীয়াংশ
ছবি সংগৃহীত

ঈদুল আজহার দিন দুপুরে পুরান ঢাকার লালবাগের পোস্তগোলার কাঁচা চামড়ার বাজারে মন্দাভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবার আড়ত মালিকরা চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরগুলোর তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে এক লাখ পিসে নির্ধারণ করেছেন। অথচ কয়েক বছর আগেও ঈদুল আজহার মাত্র তিন দিনে এই বাজারে প্রায় তিন লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ হতো।

সাভারের বিসিক শিল্পনগরীর ট্যানারিপল্লিতেও চামড়া সরবরাহ গত বছরের তুলনায় কম বলে ট্যানারি মালিকরা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এবার দেশে প্রায় এক কোটি পশু কোরবানি হতে পারে। সেই হিসেবে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পশুর চামড়া ট্যানারিগুলোতে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ট্যানারি মালিকরা।

মন্দার পেছনে একাধিক কারণ

ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসানের কারণে চামড়া ব্যবসায়ীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি ট্যানারি মালিকরা সরাসরি চামড়া কেনার প্রবণতা বাড়িয়েছেন, ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আফতাব খান জানান, বর্তমানে কোরবানির ৮০ ভাগ চামড়া ট্যানারি মালিকরা সরাসরি কিনে নেন এবং পোস্তগোলায় আসে মাত্র ২০ ভাগ।

এর পাশাপাশি এবারের ঈদুল আজহায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও গরমে চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারিয়েছেন। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত লবণ ও রাসায়নিকের দামও কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ

চামড়া সংরক্ষণ ও সংগ্রহ নিশ্চিত করতে সরকার এবার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের জন্য ১৭ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চামড়া সংরক্ষণবিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য উপজেলা পর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা এবং জেলা পর্যায়ে ৭৫ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩ লাখ পোস্টার ও ৮ লাখ লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ এবং বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। ঈদের তিন দিন আগে থেকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সচেতনতামূলক তথ্যচিত্র প্রচার করা হয়। ঈদের আগের জুমার নামাজে সারা দেশের মসজিদে ইমাম ও খতিবদের মাধ্যমে চামড়া সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

চামড়ার দামও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। লবণযুক্ত গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভেতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। খাসির চামড়া সারা দেশে ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা প্রতি বর্গফুট নির্ধারিত হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিকল্পনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এ বছর চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।

ট্যানারিতে প্রস্তুতি, উদ্বেগও আছে

সাভারের হরিণধারা এলাকার ট্যানারিগুলোতে সরেজমিন দেখা গেছে, শ্রমিকরা পর্যাপ্ত লবণ ও রাসায়নিক মজুত করা এবং পুরোনো বর্জ্য অপসারণের কাজ সম্পন্ন করেছেন। তরল বর্জ্য শোধনের জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সংস্কার ও পরিষ্কার করে সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।

এবিসি ট্যানারির মালিক ইমাম হোসেন জানান, সক্ষমতা অনুযায়ী চামড়া কেনা হবে, তবে অতিরিক্ত গরম ও বিদ্যুৎ সমস্যায় চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ জানান, প্রতি বছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। সেই বিবেচনায় এবার ৮০ থেকে ৮৫ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, পশু জবাইয়ের পর দ্রুত চামড়া ছাড়িয়ে সঠিকভাবে লবণ দিলে ভালো দাম পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি শাখাওয়াত উল্লাহ মৌসুমি ব্যবসায়ীদের চামড়া কেনার পর দ্রুত লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেন।

ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম শাহনেওয়াজ জানান, এবার কাঁচা চামড়া সরবরাহ কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং সে বিষয়ে ট্যানারি মালিকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

চামড়া নষ্টের হার উদ্বেগজনক

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফ উদ্দিন আহমদ খান জানান, গত বছর ২০ শতাংশের বেশি চামড়া নষ্ট হয়েছে। এবারও অতিরিক্ত গরম ও বৃষ্টির কারণে ঝুঁকি রয়েছে। তিনি সতর্ক করেন, সরকারি সহায়তা অব্যাহত না থাকলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চামড়া বাজারে পিছিয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান জানান, প্রতিবছরই রাতের বেলা সংগ্রহ করা চামড়ায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম মূল্যে বিক্রির অভিযোগ ওঠে। রাতে চামড়া সংরক্ষণে বিলম্ব হলে মান কমে যায় এবং ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য দিতে আগ্রহী হন না।

সাবেক সভাপতি আফতাব খান মনে করেন, শুধু দাম বাড়ালেই হবে না, ঢাকার বাইরের চামড়া স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা গেলে দরপতন ও পচনের ঝুঁকি কমবে। দীর্ঘপথে পরিবহনের কারণে চামড়া নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা বিপুল

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়, যার ৬০ ভাগের বেশি আসে কোরবানির মৌসুমে। এর মধ্যে গরুর চামড়া ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ছাগলের চামড়া ৩১ দশমিক ৮২ শতাংশ, মহিষের চামড়া ২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ভেড়ার চামড়া ১ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, যা সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে ২২ লাখের বেশি।

পোস্তগোলার ব্যবসায়ীরা জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সরকারের উদ্যোগগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে চামড়া নষ্টের শঙ্কা কমে আসবে এবং ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নতি হবে।



banner close
banner close