রবিবার

২৪ মে, ২০২৬ ১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

১৫০০ কোটি টাকায় ‘নগদ’ অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় আবুল খায়ের গ্রুপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ০৮:১৬

শেয়ার

১৫০০ কোটি টাকায় ‘নগদ’ অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় আবুল খায়ের গ্রুপ
ছবি সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক জটিলতা ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় থাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’ নতুন মালিকানার পথে এগোচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আবুল খায়ের গ্রুপ প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, নগদের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার দায় পরিশোধের দায়িত্ব নেবে আবুল খায়ের গ্রুপ। দায় পরিশোধের পর সরকার প্রায় ৯০০ কোটি টাকা পাবে। তবে এ লেনদেন চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কর্তৃক দায়ের করা মামলাগুলোর নিষ্পত্তি প্রয়োজন হবে।

এর আগে সৌদি আরবভিত্তিক একটি শিল্পগোষ্ঠী প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকায় নগদ অধিগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করলেও সরকার তাতে সম্মতি দেয়নি।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, কোটি কোটি গ্রাহকসম্পন্ন এই ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্মকে টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী মূলধন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দক্ষ করপোরেট ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এ কারণেই সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী হিসেবে আবুল খায়ের গ্রুপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামে একটি ছোট বিড়ি কারখানা হিসেবে যাত্রা শুরু করা আবুল খায়ের গ্রুপ বর্তমানে ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিকস, খাদ্যপণ্য, তামাক ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

মন্ত্রণালয়ে বৈঠক

গত বৃহস্পতিবার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে এ বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে নগদের দায়দেনা, চলমান মামলা এবং সম্ভাব্য মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি আবুল খায়ের গ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

৬০০ কোটি টাকার ‘ফেইক’ ই-মানির অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, নগদের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অবৈধ বা ‘ফেইক’ ই-মানি ইস্যুর অভিযোগও রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহকের জমাকৃত অর্থের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করে তার বিপরীতে ই-মানি ইস্যু করতে হয়। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, প্রকৃত অর্থ সংরক্ষণ না করেই সমপরিমাণ ডিজিটাল অর্থ বাজারে ছাড়া হয়েছিল, যা বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তারল্য সংকট কাটাতে বিনিয়োগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিশাল আর্থিক ঘাটতি ও তারল্য সংকট মোকাবিলায় সরকার একটি শক্তিশালী বিনিয়োগকারী খুঁজছিল। আবুল খায়ের গ্রুপের অংশগ্রহণকে সে উদ্যোগেরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সরকারের ধারণা, বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং শক্তিশালী সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো নগদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো পুনর্গঠন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।

সাড়ে ৫ কোটি গ্রাহক, দৈনিক লেনদেন ৭০০ কোটি টাকা

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও নগদের বাজার অবস্থান এখনও উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান গ্রাহকসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি এবং দৈনিক লেনদেন ৭০০ কোটির বেশি। এমএফএস খাতে বিকাশের পরেই নগদের অবস্থান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় গ্রাহকভিত্তি ও বিস্তৃত নেটওয়ার্ক যেকোনো বিনিয়োগকারীর জন্য আকর্ষণীয় ব্যবসায়িক সম্পদ। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখনও বাজারে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা ধরে রেখেছে।

আয়-ব্যয়ের চিত্র

নগদ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে নিজস্ব আয় দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যদিও এখনো লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটি মূলত ‘ব্রেক-ইভেন’ অবস্থায় রয়েছে।

বর্তমানে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক মিলিয়ে প্রায় ৮০০ কর্মী কাজ করছেন, যার মধ্যে নিয়মিত কর্মী ৬২৫ জন। মাসিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ৮০ কোটি টাকা। ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে বিজ্ঞাপন কার্যক্রম কমিয়ে আনা হয়েছে এবং অফিস পরিচালনায়ও সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নগদের প্রধান আয়ের উৎস ব্যাংকে সংরক্ষিত অর্থের সুদ। প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা সুদ আয় হয়। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার রেমিট্যান্সও নগদের মাধ্যমে দেশে আসে।

প্রশাসনিক পরিবর্তন ও মালিকানা বিতর্ক

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। পরে উচ্চ আদালত সেই সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করলে দায়িত্ব ফিরে যায় ডাক অধিদপ্তরের কাছে।

নগদের যাত্রা শুরু হয় ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ। ‘ডাক বিভাগের ডিজিটাল লেনদেন’ হিসেবে প্রচারিত হলেও এর মালিকানা ও আইনি কাঠামো নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ‘থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের ব্র্যান্ড ব্যবহার করে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ডাক অধিদপ্তরের সরাসরি মালিকানা বা শেয়ার ছিল না।

পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মালিকানা অংশীদারিত্ব, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা, অর্থ পাচারের অভিযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিভ্রান্ত করার জন্য পৃথক রিপোর্টিং ব্যবস্থা তৈরির অভিযোগও সামনে আসে।

সরকারের অবস্থান

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, “নগদ দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। গ্রাহকের স্বার্থ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেই সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। নগদকে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করপোরেট কাঠামোর আওতায় আনতে কাজ চলছে।”

অন্যদিকে নগদের হেড অব মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “নগদে গ্রাহকের অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব আয়ের ওপর নির্ভর করেই পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, নতুন কোনো বিনিয়োগকারী যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে বর্তমান প্রশাসনের মন্তব্য করার সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সম্ভাব্য অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে তা দেশের মোবাইল আর্থিক সেবা খাতে অন্যতম বড় করপোরেট পুনর্গঠন হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে চূড়ান্ত চুক্তির আগে আইনি ও নিয়ন্ত্রক জটিলতা নিরসনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।



banner close
banner close