বৃহস্পতিবার

২১ মে, ২০২৬ ৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ, উদ্বেগে বিনিয়োগ ও ব্যাংক খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ মে, ২০২৬ ০৮:৪৫

শেয়ার

অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ, উদ্বেগে বিনিয়োগ ও ব্যাংক খাত
ছবি সংগৃহীত

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধস, সরকারের বাড়তি ঋণনির্ভরতা, জ্বালানি সংকট ও ব্যাংক খাতে খেলাপিঋণের চাপের মধ্যে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নতুন উদ্বেগের মুখে পড়েছে। অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, সুদহার ও বিনিময় হারের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের মূল্যস্ফীতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি, সুদের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে এবং বিনিময় হারও অনেকাংশে প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। এতে অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে না।

তিনি জানান, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমানে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য নেতিবাচক সংকেত। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণে অনীহা তৈরি হয়েছে এবং নতুন শিল্প স্থাপনের হারও কমে গেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির বড় পতন

বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা গত ২৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৫ সালের নভেম্বরেও এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

২০২৬ সালের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকা। তবে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও নতুন বিনিয়োগের গতি কমেছে বলে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কয়েকটি বড় শিল্পগ্রুপ কার্যক্রম সংকুচিত করেছে। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান কম সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক পরিবেশ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়, লজিস্টিক দুর্বলতা ও মূল্যস্ফীতির মতো কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয়নি। ফলে বিনিয়োগ পরিবেশে দৃশ্যমান উন্নতি আসেনি।

উচ্চ সুদে চাপে উৎপাদনমুখী শিল্প

বর্তমানে ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পঋণের সুদহার ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এ ধরনের উচ্চ সুদে উৎপাদনমুখী শিল্প পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসার খরচ কমাতে হবে। এজন্য জ্বালানির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। তার মতে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেয়।

ব্যাংকারদের একাংশের মতে, খেলাপিঋণের চাপ এবং সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের কারণে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে ঋণ দিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাত কার্যত ঋণসংকটে পড়ছে।

সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার এক লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে জুলাই থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার ইতোমধ্যে এক লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা। এতে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণ স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকায়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সরকারের ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ শতাংশের ঘরে।

অর্থনীতিবিদরা এ পরিস্থিতিকে “ক্রাউডিং আউট” হিসেবে উল্লেখ করছেন। অর্থাৎ সরকার অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে।

ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ঝুঁকছে ব্যাংক

বর্তমানে সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছে। ব্যাংকগুলোর কাছে এটি তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তারা শিল্পঋণের পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে অনেক ব্যাংকের বড় অংশের আয় আসছে ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি কমলেও উৎপাদনশীল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করছে। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার সহজ সমাধান হিসেবে ব্যাংক ঋণের পথ বেছে নিচ্ছে। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও সংকুচিত হতে পারে।

তার মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি, খাদ্য ও আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে ভর্তুকির চাপও বাড়তে পারে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে ঋণের চাপ আরও বাড়বে।

নীতিগত অস্পষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ

ব্যাংকারদের একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল অগ্রাধিকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো নাকি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো—তা স্পষ্ট নয়।

ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ, ট্রেড ফাইন্যান্সে সুদসীমা নির্ধারণ এবং বৈদেশিক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধিও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ব্যাংকারদের মতে, নীতিগত অনিশ্চয়তা থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চান না।

খেলাপিঋণ তদারকিতে কঠোরতা

অতীতের ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বড় ঋণের ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বিতরণ করা ২০ কোটি টাকার বেশি প্রতিটি ঋণের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন যাচাই করছে ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী, জামানতের বৈধতা এবং ঋণের অর্থ যথাযথ খাতে ব্যবহার হয়েছে কিনা। ব্যাংকাররা বলছেন, ভুয়া জামানত ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তবে অতিরিক্ত সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করলে প্রবৃদ্ধি আরও কমে যেতে পারে। ফলে আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বাজেটে কর ফাঁকি রোধ, করজাল সম্প্রসারণ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, উৎপাদনশীল খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, খেলাপিঋণ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তাদের মতে, শুধু বড় বাজেট ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও কার্যকর বাস্তবায়নই আগামী অর্থবছরে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।



banner close
banner close