বুধবার

২০ মে, ২০২৬ ৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

আসছে করের ফাঁদ, নতুন বাজেটে কতটা খালি হবে পকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০ মে, ২০২৬ ০৮:২৩

শেয়ার

আসছে করের ফাঁদ, নতুন বাজেটে কতটা খালি হবে পকেট
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা এবং রাজস্ব ঘাটতির চাপে থাকা অর্থনীতিতে নতুন বাজেটকে ঘিরে বাড়ছে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি, আয় বাড়েনি, ব্যবসায় মন্দাভাব চলছে। এমন বাস্তবতায় নতুন কর আরোপ কিংবা বিদ্যমান কর বৃদ্ধির আলোচনা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ের চাপ বাড়লেও সেই বোঝার বড় অংশ বহন করছে সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে ধনী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কর ফাঁকি, সম্পদ গোপন, অর্থপাচার ও কর বকেয়ার মতো বড় অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ সীমিত। ফলে করব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেওয়া রাইডার সাইফুল ইসলাম বলেন, “কিস্তিতে মোটরসাইকেল কিনে রাইড শেয়ার করে সংসার চালাই। আবার নতুন কর দিলে বাঁচবো কীভাবে?”

এই প্রশ্ন এখন শুধু মোটরসাইকেল চালকদের নয়, বরং লাখো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

বাড়ছে কর, কমছে স্বস্তি

বাজেট-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আসন্ন বাজেটে মোটরসাইকেল, ইন্টারনেট সেবা, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, কৃষিপণ্য আমদানি, ভোগ্যপণ্যের কাঁচামাল, স্থানীয় এলসি কমিশন এবং ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প খাতে নতুন কর বা কর বৃদ্ধির প্রস্তাব আসতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব করের চূড়ান্ত চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। কারণ ব্যবসায়ীরা বাড়তি কর পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করেন। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

বর্তমানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, শাকসবজি থেকে শুরু করে বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয়ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে নতুন কর মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার ইতোমধ্যে সঞ্চয় কমিয়ে দিয়েছে। কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ সন্তানদের কোচিং বন্ধ করছেন, আবার কেউ কম ভাড়ার বাসা খুঁজছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাস্তব আয় কমে যাওয়ায় মানুষের ভোগক্ষমতা কমছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পরোক্ষ করের বোঝা

বাংলাদেশের করব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে অর্থনীতিবিদরা দেখছেন অতিরিক্ত পরোক্ষ করনির্ভরতা। দেশে রাজস্বের বড় অংশ আসে ভ্যাট, উৎসে কর ও আমদানি শুল্ক থেকে। এসব কর ধনী-গরিব সবার জন্য প্রায় একই হারে প্রযোজ্য।

ফলে একজন দিনমজুর, রিকশাচালক বা নিম্ন আয়ের ব্যক্তি যে সাবান, তেল বা মোবাইল ডাটা কিনছেন, সেই পণ্যে একই হারে ভ্যাট দিচ্ছেন একজন ধনী ব্যবসায়ীও। এতে করব্যবস্থার ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

‘ভয়েস ফর রিফর্ম’-এর এক গোলটেবিল আলোচনায় অর্থনীতিবিদরা জানান, দেশে মোট কর আদায়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে পরোক্ষ কর থেকে। অথচ উন্নত অর্থনীতিতে আয়কর ও সম্পদ করের মতো প্রত্যক্ষ কর রাজস্ব ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “যেখানে নিশ্চিত ভ্যাট আদায় হয়, এনবিআর সেখানেই কর বাড়ায়। কিন্তু প্রকৃত আয়কর আদায়ে তারা ঝুঁকি নিতে চায় না।”

কর ফাঁকি ও প্রভাবশালীদের প্রভাব

অর্থনীতিবিদদের মতে, করব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারা। অভিজাত এলাকার অনেক বাড়ির মালিক প্রকৃত ভাড়া আয় গোপন করলেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কম দেখা যায়।

একইভাবে বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের বড় অংশ প্রকৃত সম্পদ বিবরণী দেন না। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিপুল কর বকেয়াও বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার ইনভয়েসিং ও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার অব্যাহত থাকায় রাষ্ট্র রাজস্ব হারাচ্ছে এবং বৈধ ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, “প্রভাবশালীরা সবসময় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। ফলে তাদের ওপর কর আরোপের উদ্যোগ নিলেও পরে তা অনেক সময় কার্যকর থাকে না।”

বড় বাজেট, বড় প্রশ্ন

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট এবং প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদনের প্রস্তুতি চলছে। সরকার বলছে, অর্থনীতিকে চাঙা করতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সম্ভব নয়।”

তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, বাস্তব সক্ষমতার তুলনায় এই বাজেট অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। কারণ গত কয়েক বছর ধরেই উন্নয়ন বাজেট ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রশ্ন তুলেছেন, “আগামী বাজেট বাস্তবসম্মত হচ্ছে, নাকি অলৌকিক প্রক্কলন?”

পরিচালন ব্যয় বাড়ছে

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, ঋণের সুদ ও প্রশাসনিক ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের বড় অংশ সময়মতো বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “শুধু বড় বাজেট নিলেই হবে না, ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি।”

কৃষি থেকে প্রযুক্তি, সবখানেই চাপ

বাজেটে কৃষিপণ্য আমদানি, ফল, প্রযুক্তিপণ্য ও কম্পিউটার হার্ডওয়্যারে কর বৃদ্ধির আলোচনা রয়েছে। এতে খাদ্যপণ্য থেকে প্রযুক্তিপণ্য পর্যন্ত সবখানেই দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, প্রযুক্তিপণ্যে কর বাড়লে ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে। কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়বে।

অভিজাত এলাকায় কর নজরদারি

এবার করজাল সম্প্রসারণেও জোর দিচ্ছে সরকার। রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি ও উত্তরার পাশাপাশি চট্টগ্রামের খুলশী এলাকায় ডোর-টু-ডোর কর জরিপ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকার সম্পদ কর আদায়েও জোর দিচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এ খাত থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জমির মৌজা মূল্য বাজারভিত্তিক করার কাজও শুরু হয়েছে।

কর সংস্কারের দাবি

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত কর সংস্কারের জন্য শুধু করহার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়ানো, সম্পদ কর কার্যকর করা, কর ফাঁকি ও অর্থপাচার রোধ এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এখন সময়ের দাবি।

কিছু স্বস্তির ইঙ্গিতও আছে

স্বাস্থ্য খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও আসতে পারে। হার্টের রিং, কিডনি ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম এবং ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর কমানোর চিন্তা করছে সরকার। এতে চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা কমতে পারে।

অন্যদিকে রাজস্ব বাড়াতে তামাক ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

সবশেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কীভাবে রাজস্ব বাড়াবে, অথচ সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন না করে।

কারণ বাজেট যত বড়ই হোক, তার প্রকৃত চাপ গিয়ে পড়ে সেই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর, যারা ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি, কম আয় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভার বহন করছে।



banner close
banner close