ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের ব্যাংক খাতে নগদ টাকার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ না পাওয়ায় গ্রাহকের চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বিশেষ করে কোরবানির পশু কেনাবেচা, ব্যবসায়িক লেনদেন ও উৎসবকেন্দ্রিক ব্যয়ের চাপ বাড়ায় নগদ অর্থের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, একটি বেসরকারি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার নগদ চাহিদাপত্র দিলেও গত এক সপ্তাহে পেয়েছে মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা। একইভাবে আরেকটি ব্যাংক ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা চেয়ে পেয়েছে মাত্র ১ হাজার কোটি টাকা। অধিকাংশ ব্যাংকের ক্ষেত্রেই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বলেন, কুরবানির ঈদকে ঘিরে নগদ টাকার চাহিদা সবসময়ই বাড়ে। তবে এবার বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যাপ্ত নগদ সরবরাহ করতে না পারায় ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ অর্থ দিতে পারছে না।
প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১০ মে ৬০০ কোটি টাকা চেয়ে তারা পেয়েছে ৪৩০ কোটি টাকা। ১১ মে ৪০০ কোটি চেয়ে পেয়েছে ২১০ কোটি, ১২ মে ৪০০ কোটি চেয়ে পেয়েছে ২২০ কোটি, ১৩ মে ৬০০ কোটি চেয়ে পেয়েছে মাত্র ১২০ কোটি, ১৪ মে ৭০০ কোটি চেয়ে পেয়েছে ২১০ কোটি, ১৭ মে ৬০০ কোটি চেয়ে পেয়েছে ১২০ কোটি এবং ১৮ মে ৬০০ কোটি টাকার বিপরীতে পেয়েছে ২১০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদকে সামনে রেখে নতুন নোটের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক টাঁকশালের কাছে অন্তত ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট চাইলেও কাগজ ও কালির সংকটের কারণে সর্বোচ্চ ৮ হাজার কোটি টাকার নোট সরবরাহ সম্ভব বলে জানিয়েছে টাঁকশাল।
তবে বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত পুরোনো নকশার প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার নোট অর্ধপ্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। চাইলে দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব নোট বাজারে ছাড়া সম্ভব হলেও আপাতত ওই নোট বাজারে না ছাড়ার সিদ্ধান্তে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি তারল্য সংকট নয়, মূলত ছাপানো নোটের সংকট। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বাজারে ছাপানো টাকার চাহিদা রয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। প্রতি বছর ঈদের সময় নগদ টাকার চাহিদা বাড়ায় নতুন নোটের সরবরাহও বাড়ানো হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত নোটের পরিবর্তে নতুন নকশার নোট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে একযোগে সব মূল্যমানের নোটের নকশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। সাধারণত ধাপে ধাপে নোটের নকশা পরিবর্তন করা হলেও এবার বিশেষ পরিস্থিতিতে একসঙ্গে সব নোটের ডিজাইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে পুরোনো নোট দীর্ঘ সময় বাজারে না ছাড়ায় চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যাংকাররা জানান, বাজারে ব্যবহৃত ছাপানো নোটের বড় অংশ মানুষের কাছে এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে থাকে। অন্যদিকে দেশের প্রায় ১২ হাজার ব্যাংক শাখার ভল্টে সাধারণত ১৬ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা মজুত থাকে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখাগুলোতে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বিনিময়ের জন্য আরও ১৪ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষিত থাকে।
তারা আরও জানান, ব্যাংকগুলো নিয়মিতভাবে বাজার থেকে ছেঁড়া, ময়লাযুক্ত ও অচল নোট সংগ্রহ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়। কিন্তু বর্তমানে পর্যাপ্ত নতুন নোট না পাওয়ায় বাজারে ছেঁড়া-ফাটা নোটের ব্যবহারও বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নতুন নকশার নোট বাজারে আনতে কিছুটা সময় লেগেছে। এ কারণেই সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, সাধারণত ছেঁড়া-ফাটা নোট বাজার থেকে তুলে ধ্বংস করা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা সম্ভব না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তবে খুব শিগগিরই ব্যাংকগুলোতে নতুন নোট সরবরাহ শুরু হবে এবং সংকট কেটে যাবে।
আরও পড়ুন:








