একীভূত পাঁচ ব্যাংকে পুরোনো মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ সীমিত বা বাতিল করার বিষয়ে সরকার পর্যালোচনা করছে। ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা সংশোধন বা বাতিলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী মহলের সমালোচনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের উদ্বেগের কারণে সরকার এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন বাস্তবায়নের জন্য বিধিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করা হলেও সেখানে ১৮(ক) ধারা নিয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা রাখা হয়নি। সরকার এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছেন, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের সাবেক মালিকদের বিরুদ্ধে জালজালিয়াতি ও নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় একাধিক মামলাও হয়েছে। এই বাস্তবতায় তাদের পুনরায় মালিকানায় ফেরানোর বিধান কার্যকর করা জটিল হতে পারে বলে মত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ রেখে আইন প্রণয়নকে ব্যাংক খাত সংস্কারের পরিপন্থী হিসেবে দেখছে। বর্তমানে আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের চলমান ঋণ কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাশাপাশি আরও প্রায় ২০০ কোটি ডলার আইএমএফ এবং ১০০ কোটি ডলার বিশ্বব্যাংক ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আপত্তির মুখে সরকার বিতর্কিত ধারা নিয়ে নতুন করে ভাবছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, আইএমএফের চলমান কর্মসূচি বাতিল হলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে দেশের ঋণমান কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদেশি ব্যাংকের ক্রেডিট লাইন সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয়ও বাড়তে পারে।
এদিকে বর্তমান সরকারপন্থি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসও সম্প্রতি গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ১৮(ক) ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে গত ১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। শুরুতে অধ্যাদেশের ৯৮টি ধারার মধ্যে কম গুরুত্বপূর্ণ ২৪টি ধারা প্রবিধানে স্থানান্তরের সুপারিশ করা হয়। পরে শেষ মুহূর্তে ১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়ায় আইনের মোট ধারা দাঁড়ায় ৭৫টিতে।
আইন প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৮(ক) ধারাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে যাতে অন্য কোনো আইন বা বিধানের চেয়েও এটি কার্যকর হয়। এই ধারার আওতায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত ব্যাংকে যে অর্থ সহায়তা দিয়েছে, তার মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ জমা দিয়েই আগের মালিকপক্ষ পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে।
তবে আইন হওয়ার আগে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী একীভূত ব্যাংকের খারাপ অবস্থার জন্য দায়ীদের পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না। ইতোমধ্যে সাবেক মালিকদের নামে-বেনামে থাকা শেয়ার জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারও শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী গত বছর শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া আমানত বিমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ হিসেবে দিয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ ছিল ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। একই সময়ে দেশের পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের গড় হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এ ছাড়া দেশের ২২টি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন:








