কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং, কলসেন্টার, পরিবহন ও খুচরা বিক্রয়সহ একাধিক খাতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব কাজ প্রযুক্তি দিয়ে সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব, সেসব পদে নিয়োজিত কর্মীরা আগামী কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
পোশাক খাতে কমছে কর্মসংস্থান
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশ নির্ভর করে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর। এই খাতে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কর্মরত। তবে অটোমেটেড মেশিন, ডিজিটাল কাটিং ও রোবোটিক সেলাই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হওয়ায় নিম্নদক্ষ শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উৎপাদন খাতে প্রায় ১৪ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। এ সময়ে খাতটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১০ শতাংশ এবং পোশাক রপ্তানি ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অথচ একই সময়ে কর্মসংস্থান ৯৫ লাখ থেকে কমে ৮১ লাখে নেমে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির স্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, একটি স্বয়ংক্রিয় সোয়েটার মেশিন দিনে প্রায় ৩০টি পণ্য তৈরি করতে পারে, যেখানে ম্যানুয়াল মেশিনে উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ পাঁচটি। গাজীপুরের এক পোশাক শ্রমিক জানান, আগে ১২ জনে যে কাজ হতো, এখন সেটি চারজনেই সম্পন্ন হচ্ছে।
ব্যাংকিং ও কলসেন্টারেও পরিবর্তনের ছায়া
ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিস্তারে ব্যাংক শাখায় ক্যাশ বিভাগ, সাধারণ গ্রাহকসেবা ও ডেটা এন্ট্রিভিত্তিক পদগুলো ঝুঁকিতে পড়ছে। বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি ডিজিটাল রূপান্তর ও অটোমেশনের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কর্মী কমানোর পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।
একইভাবে এআইচালিত চ্যাটবট ও ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রযুক্তির কারণে কলসেন্টার খাতেও জনবলের চাহিদা কমে আসছে। গ্রাহকের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, অভিযোগ গ্রহণ বা তথ্য সরবরাহের মতো কাজ এখন স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে।
অন্যান্য খাতেও পরিবর্তন দৃশ্যমান
খুচরা বাজারে ই-কমার্সের প্রসার এবং স্বয়ংক্রিয় বিলিং ব্যবস্থার কারণে বিক্রয়কর্মী ও ক্যাশিয়ার পদে চাহিদা কমার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবহন খাতে টিকিটিং ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থাপনার কিছু পদও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। গণমাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তিনির্ভর সংবাদ তৈরি ও সাধারণ অনুবাদের কাজেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা ও বেকারত্বের চিত্র
বিশ্বব্যাংকের সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রায় ৭ শতাংশ চাকরি সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে ১৫ শতাংশ চাকরিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট জানিয়েছেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ-তরুণী, কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ মানুষের জন্য। ফলে প্রায় ৫৩ লাখ তরুণ এখনো কর্মহীন রয়েছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকার মানুষের সংখ্যা ২৬ লাখ ৬০ হাজার এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। তবে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে এই হার প্রায় ৮৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিবিএসের তথ্যে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিই এর মূল কারণ বলে গবেষকরা মনে করছেন।
কোন কর্মীরা নিরাপদ, কী করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও মানবিক যোগাযোগনির্ভর পেশাগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকবে। চিকিৎসক, দক্ষ প্রকৌশলী, সফটওয়্যার ডেভেলপার, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ডেটা বিশ্লেষক, অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের চাহিদা বরং বাড়বে।
শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু একাডেমিক ডিগ্রি নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং দ্রুত নতুন কিছু আত্মস্থ করার মানসিকতাই আগামীর শ্রমবাজারে টিকে থাকার মূল হাতিয়ার হয়ে উঠবে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণে বড় বিনিয়োগ করার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন:








