দেশের ৩৩টি ব্যাংকে স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রা মিলিয়ে প্রায় ৫৩ কোটি টাকার আমানত দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে, যার কোনো দাবিদার নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব, স্থায়ী আমানত এবং বিভিন্ন ডিপোজিট স্কিমে জমা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে দাবিদার না পাওয়া গেলে এই অর্থ সরকারি কোষাগারে স্থানান্তর করা হয়।
অদাবিকৃত আমানতের পরিমাণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যমতে, ৩৩টি ব্যাংকের স্থানীয় মুদ্রায় অদাবিকৃত আমানতের পরিমাণ ৪৯ কোটি ৮ লাখ ৬০ হাজার ৪৯৬ টাকা। এর বাইরে বৈদেশিক মুদ্রায় রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার ২৫৮ মার্কিন ডলার, ৪৬ হাজার ৪৮৬ পাউন্ড এবং ৫ হাজার ২৭৫ ইউরো সমমান অর্থ।
দাবিহীন আমানতের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বিদেশি মালিকানার সিটি ব্যাংক এনএ, যেখানে প্রায় ১৫ কোটি টাকার আমানত অদাবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে ব্র্যাক ব্যাংকে প্রায় ৮ কোটি, এইচএসবিসিতে প্রায় ৬ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকে প্রায় ৫ কোটি এবং সিটি ব্যাংকে প্রায় ৩ কোটি টাকার অদাবিকৃত আমানত রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, বাকি ২৮টি ব্যাংকের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। সব ব্যাংকের তথ্য হিসাবে আনলে মোট অদাবিকৃত আমানতের পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
কেন অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় হয়
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মূলত কয়েকটি কারণে ব্যাংক হিসাব বছরের পর বছর নিষ্ক্রিয় থাকে। এর মধ্যে রয়েছে হিসাবধারীর মৃত্যু, বিদেশে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়া, ঠিকানা পরিবর্তন, যোগাযোগের তথ্য হালনাগাদ না থাকা এবং উত্তরাধিকারীদের হিসাব সম্পর্কে অজ্ঞতা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মকানুন
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো হিসাবে টানা ১০ বছর কোনো লেনদেন না হলে সেটিকে অদাবিকৃত আমানত হিসাব বলে গণ্য করা হয়। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব এই নিয়মের আওতার বাইরে।
অদাবিকৃত হিসাব চিহ্নিত হওয়ার পর প্রায় এক বছর হিসাবধারীর নাম, হিসাব নম্বর ও আমানতের পরিমাণসহ বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশিত থাকে। ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সরিয়ে নেওয়ার পরও আরও এক বছর দাবি গ্রহণ করা হয়। প্রতি বছর এপ্রিল মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে এই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে কমপক্ষে ১২ বছর তিন মাস সময় দেওয়া হয় গ্রাহক বা তাঁর উত্তরাধিকারীকে অর্থ ফেরত নেওয়ার জন্য। এরপরও দাবিদার না পাওয়া গেলে অর্থ সরকারের কোষাগারে স্থানান্তর করা হয়।
ব্যাংকগুলোর অবস্থান
চলতি বছরের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ৩৩টি ব্যাংক তাদের অদাবিকৃত আমানত বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করেছে। ১০টি ব্যাংক সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছে। তবে বাকি ১৮টি ব্যাংক এখনো অর্থ জমা দেয়নি। সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে অদাবিকৃত আমানত নিজস্ব সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, অর্থ হস্তান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের ঠিকানায় চিঠি, এসএমএস ও ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি এবং ব্যাংকের ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ করা হয়।
অর্থ ফেরতের সুযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, অদাবিকৃত আমানত বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থায়ীভাবে রাখা হয় না; নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তা সরকারি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। তবে পরবর্তীতে কোনো আমানতকারী বা উত্তরাধিকারী উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে দাবি করলে ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্রাহককে অর্থ পরিশোধের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি হিসাব থেকে সমন্বয় করা হয়।
আরও পড়ুন:








