রবিবার

১৭ মে, ২০২৬ ৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

অনিয়ম-লুটপাটে ব্যাংক খাতে মূলধনে বড় ধস

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ মে, ২০২৬ ০৭:৩৭

শেয়ার

অনিয়ম-লুটপাটে ব্যাংক খাতে মূলধনে বড় ধস
ছবি সংগৃহীত

লাগামহীন অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণে দেশের ব্যাংক খাতের মূলধনভিত্তি মারাত্মক চাপে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে অন্তত ২০টি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে পুরো ব্যাংক খাতের সার্বিক মূলধন ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে খাতটির মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক ধারায় নেমে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল তদারকির কারণে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে বিগত সরকারের সময় নানা অনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিতরণ করা বিপুল ঋণ পরবর্তীতে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। পরে পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ায় ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। তবে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে না পারায় ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। এর ফলে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের চাপ বেড়ে মূলধন ঘাটতি আরও গভীর হয়েছে।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মূলধন ঘাটতি শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর জন্য নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলো লভ্যাংশ দিতে পারে না, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনেও নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকের কার্যকারিতা মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো মূলধন পর্যাপ্ততা। উন্নত বিশ্বেও কোনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে এই সূচককে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দেশে বছরের পর বছর মূলধন ঘাটতি নিয়ে অনেক ব্যাংক টিকে আছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ৬২টি ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। অনেক ব্যাংক নিজস্ব সক্ষমতায় টিকে থাকতে পারছে না, তবু নানা উপায়ে সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, জনগণের করের টাকা ব্যবহার করে কেন দুর্বল বেসরকারি ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা হবে। তার মতে, নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে ব্যাংকগুলোকে মূলধন ঘাটতি পূরণের নির্দেশ দিতে হবে, অন্যথায় বাজার থেকে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ এবং অতিরিক্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফার রাখতে হয়। পাশাপাশি ব্যাসেল-৩ কাঠামোর আওতায় ২০২৬ সালের মধ্যে লিভারেজ অনুপাত ৪ শতাংশে উন্নীত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু আলোচ্য ২০টি ব্যাংক এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৪টি, বিশেষায়িত ২টি এবং বেসরকারি ১৪টি ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে একীভূত হওয়া শরিয়াহভিত্তিক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৫ কোটি এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা।

বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ৬ হাজার ৫৩৫ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি এবং বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

বেসরকারি খাতের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এছাড়া এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকও উল্লেখযোগ্য মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, কয়েকটি ব্যাংক সাময়িকভাবে ঘাটতি কাটিয়ে উঠলেও সার্বিক চিত্র এখনও উদ্বেগজনক। গত ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে, যেখানে নিয়ম অনুযায়ী এটি কমপক্ষে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ার কথা। এক বছর আগেও এই হার ইতিবাচক অবস্থানে ছিল।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই সুশাসন, কঠোর তদারকি, খেলাপি ঋণ আদায় এবং প্রয়োজনে অকার্যকর ব্যাংকের পুনর্গঠন বা বাজার থেকে অপসারণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।



banner close
banner close