রবিবার

১৭ মে, ২০২৬ ৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ব্যবসায় বিনিয়োগ কমছে, বাড়ছে উদ্যোক্তাদের হতাশা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ মে, ২০২৬ ০৬:৪৯

শেয়ার

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ব্যবসায় বিনিয়োগ কমছে, বাড়ছে উদ্যোক্তাদের হতাশা
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু ও পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় ২৩টির বেশি দপ্তর থেকে প্রায় ১৫০টি অনাপত্তিপত্র, লাইসেন্স ও ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে হয়। এই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে, উদ্যোক্তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন এবং দেশে বিদেশি বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আজ একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বিনিয়োগ কমছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন উদ্যোক্তারা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশে নিট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ ১ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৮তম। বিশ্বব্যাংক পরে এই মূল্যায়ন বন্ধ করলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

ব্যবসায়ী নেতাদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, সরকার নানা ধরনের নীতিসহায়তার কথা বললেও বাস্তবে ব্যবসা পরিচালনা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ব্যবসার প্রধান বাধা এখন আমলাতন্ত্র। একটি পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে মাসের পর মাস যেতে হয়।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জের একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাঁর কারখানার ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন পাঁচ বছর আটকে রেখেছিলেন।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় হয়রানি হয় আয়কর ও ভ্যাট আদায়ে। নিয়মিত কর পরিশোধ করা সত্ত্বেও পাঁচ থেকে ছয় বছর পর হঠাৎ কোটি টাকার ভ্যাট নোটিস পাঠানো হয়। পরে হিসাব করে দেখা যায়, প্রকৃত দাবি মাত্র কয়েক লাখ টাকা, অথবা কোনো বকেয়াই নেই। তিনি দাবি করেন, প্রতি বছরের করের হিসাব সেই বছরেই নিষ্পন্ন করা হোক এবং পরবর্তীতে হয়রানি বন্ধ করা হোক।

ধাপে ধাপে বাধার চিত্র

ব্যবসা শুরুর পথে উদ্যোক্তাদের একাধিক স্তরে বাধার মুখোমুখি হতে হয়।

ট্রেড লাইসেন্স পেতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হয়। এর বাইরে ভূমি কর ও হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়, যা নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি। কোম্পানি নিবন্ধন, আয়কর ও ভ্যাট নিবন্ধনেও রয়েছে আলাদা জটিলতা।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সবুজ, কমলা বা লাল ক্যাটাগরির ছাড়পত্র পেতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগে। ছাড়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া এবং মূল নির্মাণকাজ শুরু করা আইনত সম্ভব হয় না।

রাজউক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্মাণ অনুমোদন পেতে মাসের পর মাস, এমনকি বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতায় জমি ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণের সুদ যোগ হয়ে প্রকল্পের শুরুতেই খরচ বেড়ে যায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।

উৎপাদন পর্যায়ে শুল্কমুক্ত বা রেয়াতি হারে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য শিল্প আইআরসি (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট) আবশ্যক। এটি না থাকলে নতুন কারখানা চালু হলেও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হয় না।

এ ছাড়া ফায়ার সেফটি প্ল্যান বা লে-আউট অনুমোদন না পেলে ব্যাংক শিল্প প্রকল্পে ঋণ ছাড় করে না, যা উদ্যোক্তাদের আর্থিক পরিকল্পনাকে সংকটে ফেলে।

ডিজিটালাইজেশন: সীমিত সুফল

সরকার ই-গভর্ন্যান্স ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে ব্যবসার নিবন্ধন অনলাইনে করা সম্ভব হলেও নাম ছাড়পত্র ও লাইসেন্স পেতে গড়ে ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবস বা তার বেশি সময় লাগছে। অনলাইনে নথি জমা দেওয়া গেলেও পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। পোর্টালের কারিগরি ত্রুটির কারণে ফি প্রদান ও নথি আপলোডেও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আওতায় প্রায় ৪০টি সেবা দিলেও বিকেএমইএ সভাপতির মতে, এই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ব্যবসায়ীদের এখনো একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আজ উচ্চপর্যায়ের সভা

পরিস্থিতি উত্তরণে আজ বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে একটি সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সভায় কোম্পানি নিবন্ধন, আয়কর ও ভ্যাট নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, শিল্প নিবন্ধন, পরিবেশ সনদ ও পরিবেশ ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন সেবা সহজীকরণ এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার সময় কমানো নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনও সভায় অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।



banner close
banner close