শনিবার

১৬ মে, ২০২৬ ২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

খাদ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশ, প্রস্তুতি কতটুকু

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬ ০৯:১৭

আপডেট: ১৬ মে, ২০২৬ ০৯:১৯

শেয়ার

খাদ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশ, প্রস্তুতি কতটুকু
ছবি সংগৃহীত

বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম উঠে আসায় খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘ সমর্থিত গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫ অনুযায়ী, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বের তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের বড় অংশ এখন বাংলাদেশসহ ১০টি দেশে অবস্থান করছে। প্রতিবেদনে একই সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু উন্নতির ইঙ্গিত দেওয়া হলেও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় এক কোটি ৫৬ লাখ মানুষ সংকটজনক পর্যায়ের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিল। এছাড়া প্রায় ৪০ লাখ মানুষ জরুরি পর্যায়ে অবস্থান করছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়া, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উন্নতি এখনও স্থায়ী নয় এবং দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের বড় অংশ খাদ্য ব্যয়ের চাপে রয়েছে।

বর্তমানে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ ও সবজিসহ নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। কেউ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার কমিয়ে দিয়েছে, কেউ ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে, আবার কেউ স্বাস্থ্য ব্যয় কমিয়ে খাদ্য ব্যয় সামাল দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্য সংকট এখন শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতার সংকট নয়। এটি ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টি, জলবায়ু ঝুঁকি ও বৈষম্যের সম্মিলিত সংকটে রূপ নিয়েছে।

এদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ও পুনরাবৃত্ত বন্যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। চলতি বছর হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে ব্যাপক বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জেলায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সুনামগঞ্জে ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বন্যা এখন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় হাওর অঞ্চলে প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর জমি ডুবে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের বিভিন্ন ধাপের বন্যায় প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে জলবায়ু দুর্যোগ এখন দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে খাদ্যে ভর্তুকি কমানোর সরকারি পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে খাদ্যে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৬১৪ কোটি টাকা কম।

চলতি অর্থবছরে খাদ্যে ভর্তুকির মূল বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় তা বাড়িয়ে ১০ হাজার ২১৪ কোটি টাকা করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে ভর্তুকি কমানো হলে টিসিবি, ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ওপর চাপ বাড়তে পারে। কারণ খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

তবে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা।

সরকার পরিবারভিত্তিক সহায়তা, কৃষি সহায়তা, নগদ ভাতা ও খাদ্য সহায়তাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, কার্যকর ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা মূলত একটি কাঠামোগত সংকট। তার মতে, বাজারে খাদ্যের সরবরাহ থাকলেও অনেক মানুষের সেই খাদ্য কেনার সক্ষমতা নেই। নিম্ন আয়, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, জলবায়ু ঝুঁকি ও দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে বিনিয়োগ, হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য স্থায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্য সহায়তা এবং পুষ্টিনিরাপত্তাকে খাদ্যনীতির কেন্দ্রে আনার বিকল্প নেই।

তাদের মতে, খাদ্যকে শুধু কৃষি বা বাজারের বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ খাদ্য সংকট শুধু ক্ষুধার নয়, এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য, অপুষ্টি ও সামাজিক অস্থিরতারও সংকট।



banner close
banner close