শনিবার

১৬ মে, ২০২৬ ২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

সঞ্চয়ের সব খাতে আস্থার সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬ ০৬:৫০

শেয়ার

সঞ্চয়ের সব খাতে আস্থার সংকট
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

দেশের মানুষের ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও বিনিয়োগের প্রায় সব খাত এখন গভীর আস্থাহীনতায় ভুগছে। ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই), শেয়ারবাজার, বিমা ও সমবায় খাতের অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। কোথাও মুনাফা তো দূরের কথা, মূল অর্থ ফেরত পাওয়াই বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত এবং আর্থিক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম বলেন, আর্থিক খাতের এই সংকট সাধারণ কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি অনেক গভীরে প্রোথিত। পুরো খাতের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি মনে করেন, আর্থিক খাতে সুশাসন ও ভালো চর্চা প্রতিষ্ঠা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণের ঘটনাও মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আস্থা ফিরিয়ে আনতে তারা নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্ত ও অর্থ উদ্ধারে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি’ কমিটি কাজ করছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করতে নিয়মিত বৈঠক, পর্ষদে পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং নতুন বেনামি ঋণ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি চাপে

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বাস্তবে এই চিত্র আরও ভয়াবহ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দীর্ঘদিন ধরে অনেক ব্যাংক প্রকৃত তথ্য গোপন করেছে। বর্তমানে ১২টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে ২৩টি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

এ অবস্থায় অনেক আমানতকারী ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ফলে ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ সংকট

এনবিএফআই খাতেও পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০টি প্রতিষ্ঠান রেড জোনে রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের পথে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।

এসব প্রতিষ্ঠানে আমানতকারী ১২ হাজারের বেশি মানুষ তাদের অর্থ ফেরতের দাবিতে আন্দোলন করছেন। খাতটিতে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকাই খেলাপি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. এমকে মুজেরী বলেন, আর্থিক খাতের প্রায় সব জায়গাতেই এখন আস্থার সংকট বিরাজ করছে। তার ভাষায়, কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থারও যোগসাজশ ছিল। তিনি বলেন, জালিয়াতদের শাস্তির আওতায় আনা এবং লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার না করলে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের হতাশা

দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের অন্যতম মাধ্যম শেয়ারবাজার হলেও বাংলাদেশে এটি দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বাজারে কারসাজি, দুর্বল কোম্পানির আধিক্য এবং কম লভ্যাংশের কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের মে মাসে দেশে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ৩২ লাখ ৭ হাজার। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৬৩ হাজারে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে গেছেন।

বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা বাড়লেও বিএসইসি বলছে, তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানান, গত দেড় বছরে বাজার কারসাজির দায়ে ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইপিও, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট গভর্ন্যান্স নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বিমা খাতে গ্রাহকের হাহাকার

বিমা খাতেও গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ ব্যাপক। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহকদের মোট বকেয়া পাওনা ৭ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে জীবনবিমা খাতেই বকেয়া প্রায় ৩ হাজার ৯ কোটি টাকা।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা লাইফ ও সানফ্লাওয়ার লাইফসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের অর্থ বছরের পর বছর আটকে রয়েছে। ফলে বিমা খাতের ওপরও সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সমবায় খাতেও অনিয়মের অভিযোগ

একসময় দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের বড় মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত সমবায় খাতও এখন নানা সংকটে জর্জরিত। দুর্নীতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পুঁজির অভাবে খাতটির কার্যকারিতা কমে গেছে। দেশে বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যার বড় একটি অংশ সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু নানা অনিয়মের কারণে মানুষ এ খাত থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক খাতে সুশাসন, জবাবদিহি ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এই আস্থা সংকট কাটানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।



banner close
banner close