বৃহস্পতিবার

১৪ মে, ২০২৬ ৩১ বৈশাখ, ১৪৩৩

রেকর্ড ঋণের ভারে উচ্চাভিলাষী বাজেট, বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ মে, ২০২৬ ০৭:২১

শেয়ার

রেকর্ড ঋণের ভারে উচ্চাভিলাষী বাজেট, বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

তহবিল সংকট, রাজস্ব ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপের মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল এ বাজেট বাস্তবায়ন বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থের বড় অংশ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে ঋণের মাধ্যমে। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কায় বাজেট সহায়তা হিসেবে আরও প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র বলছে, আগামী অর্থবছরের জন্য বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৬ হাজার কোটি টাকা। তবে প্রথম ৯ মাসে ছাড় করা গেছে মাত্র ৪৭ হাজার কোটি টাকা।

গত অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় এবার বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত এডিপির তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

একদিকে নতুন ঋণের পরিকল্পনা, অন্যদিকে পুরনো ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার মূল ঋণ এবং প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সুদ। শুধু ২০২৯-৩০ অর্থবছরেই প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে, যা হবে সর্বোচ্চ চাপের বছর।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন মূল ঋণ পরিশোধ শুরু হচ্ছে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কিস্তি আগামী বছরগুলোতে পরিশোধ করতে হবে। তবে এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফলও পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। ফলে ঋণের চাপ অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪০৯ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩৩৫ কোটি ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির কারণে ঋণ পরিশোধ ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, চলতি অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এদিকে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।

সরকারি ব্যয় কমানোর নানা উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে ব্যয়ের চাপ কমছে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ধারাবাহিকভাবে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যেই উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে নতুন করে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সংস্থাটি নতুন কিস্তির বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা দেয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণেই এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দামও সমন্বয় করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করে কম দামে বিক্রির কারণে বড় অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছিল। আইএমএফও ভর্তুকি কমানোর চাপ দিচ্ছিল। ফলে সরকারকে জ্বালানির দাম বাড়াতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

চলতি অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধেই বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। আগামী বাজেটে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে জ্বালানি ভর্তুকিও বাড়ছে। এর সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং নতুন বেতন কাঠামোর চাপ যুক্ত হওয়ায় বাজেটের আকার আরও বড় হচ্ছে। ফলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ যেন ঋণ ফাঁদে না পড়ে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারের সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া উচিত সম্পদ আহরণ ও রাজস্ব বাড়ানোর দিকে।”

অন্যদিকে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “শুধু ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, ভর্তুকি ও রাজস্ব পরিস্থিতি মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর কোথায় কী চাপ তৈরি হচ্ছে, তার স্পষ্ট মূল্যায়ন জরুরি।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণ, বাড়তে থাকা ব্যাংকঋণ, রাজস্ব ঘাটতি এবং সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপের মধ্যে বড় বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সময়মতো কাঠামোগত সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে অর্থনীতি আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।



banner close
banner close