সোমবার

১১ মে, ২০২৬ ২৮ বৈশাখ, ১৪৩৩

গ্রিসের মডেলে ব্যাংক খাত সংস্কারের ভাবনা, বাংলাদেশ কি পারবে ঘুরে দাঁড়াতে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ মে, ২০২৬ ০৮:১৬

শেয়ার

গ্রিসের মডেলে ব্যাংক খাত সংস্কারের ভাবনা, বাংলাদেশ কি পারবে ঘুরে দাঁড়াতে?
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে গ্রিসের সংস্কার মডেল অনুসরণের আলোচনা সামনে এসেছে। অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করছেন, দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ, মূলধন সহায়তা, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের আর্থিক খাতও সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর গভীর আর্থিক বিপর্যয়ে পড়ে গ্রিস। সে সময় দেশটির প্রায় সব ব্যাংক দেউলিয়ার মুখে পড়ে এবং ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক এটিএম বুথ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এক পর্যায়ে দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৪৯ শতাংশে পৌঁছে যায়।

পরবর্তীতে গ্রিস সরকার ও ইউরোপীয় তহবিলের সহায়তায় প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউরো মূলধন সহায়তা দিয়ে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি হারকিউলিস নামে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিভিত্তিক প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ইউরোর খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। সংস্কারের অংশ হিসেবে ৬৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কমিয়ে চারটি বড় ব্যাংকের অধীনে আনা হয়। বর্তমানে গ্রিসের খেলাপি ঋণের হার কমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশেও ব্যাংক ও আর্থিক খাতে একই ধরনের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। অন্তত এক ডজন ব্যাংক গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে সমস্যায় পড়েছে। মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে ২৪টি ব্যাংক। বর্তমানে পুরো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এ হার ৩৫ শতাংশ অতিক্রম করেছিল।

নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টির বেশি এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ৯৯ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় সফল হয়েছে। গ্রিস, তুরস্ক, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে। তবে তিনি নীতির ধারাবাহিকতার অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক রেজল্যুশন অর্ডিন্যান্সসহ বেশ কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা না থাকায় সেগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে গ্রিসের সংকটকালের কিছু মিল রয়েছে। গত দেড় দশকে ঋণনির্ভর উন্নয়ন ব্যয়, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, উচ্চ সুদের সরকারি ঋণ, দুর্নীতি এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। ২০০৯ সালে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। বর্তমানে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলারে।

এদিকে ব্যাংকগুলো এখন বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী। কারণ ট্রেজারি বিল ও বন্ডে উচ্চ সুদ পাওয়া যাচ্ছে। ২০২২ সালে যেখানে বিল-বন্ডের সুদহার ছিল ২ থেকে ৫ শতাংশ, বর্তমানে তা ১০ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে গেছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ দিতে ব্যাংকগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ বাস্তবায়নে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। দেশে এ ধরনের সংস্কৃতির অভাব থাকায় গ্রাহকদের মধ্যেও উদ্বেগ কাজ করছে। এজন্য রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তবে অতীতে মূলধন সহায়তা দিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। বেসিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হাজার কোটি টাকার মূলধন ও তারল্য সহায়তা দেওয়া হলেও সেগুলো স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং জবাবদিহি নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই ব্যাংক খাতের টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব।



banner close
banner close