দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সংকট আরো গভীর হচ্ছে। উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপে একদিকে যেমন বিপাকে পড়েছেন উদ্যোক্তারা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও হয়ে উঠছে কঠিন। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্পোৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের সুদহার সীমা তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর পর ব্যাংকঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এর প্রভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা বর্তমানে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বরং বিদ্যমান ঋণের চাপ সামলাতেই তাদের অধিকাংশ সময় ব্যয় হচ্ছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদনশীল খাত। তাঁর ভাষ্য, ঋণের বাড়তি ব্যয় ব্যবসা পরিচালনার খরচ এতটাই বাড়িয়ে দিচ্ছে যে উৎপাদন আর প্রতিযোগিতামূলক থাকছে না। কাঁচামাল আমদানি থেকে শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাড়তি সুদের চাপ ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমিয়ে দিচ্ছে।
শিল্প খাতে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় গত এক বছরে গড়ে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে পোশাক খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা লোকসানে পড়েছে। গত তিন বছরে অন্তত ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। যেসব শিল্পকারখানা এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোর অনেকই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
এরই মধ্যে গত ১৮ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দরে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে।
একই সঙ্গে এলপিজির দামও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। গত ফেব্রুয়ারিতে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল এক হাজার ৩৫৬ টাকা। বর্তমানে সরকার নির্ধারিত মূল্য দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৪০ টাকা। তবে বাজারে অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তাদের আরো ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
বিদ্যুতের দামও আবার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিপিডিবি। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে ব্যয় আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাস্তবে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম গত এক বছরে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
রাজধানীর খুচরা বাজারে ডিমের দাম গত তিন মাসে ২১ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কাঁচা পেঁপের দাম বেড়েছে ১৫০ থেকে ১৬৭ শতাংশ পর্যন্ত। বেগুনের দাম বেড়েছে ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ এবং কাঁচা কলার দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। সয়াবিন তেল ও চালের দামও বেড়েছে বিভিন্ন মাত্রায়।
অন্যদিকে মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণার কথা থাকলেও অর্থ সংকটের কারণে তা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অন্তত এক লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। কিন্তু রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে সরকারও আর্থিক চাপে রয়েছে।
বস্ত্র খাতের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, নীতিগত সহায়তার অভাব এবং উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। তাঁর মতে, সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আমদানিনির্ভরতার পরিবর্তে আমদানি বিকল্প শিল্পে জোর দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, শুধু কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়। উৎপাদনশীল খাতকে টিকিয়ে রাখতে সুদের হার, জ্বালানি ব্যয় এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিতে দ্রুত সমন্বয় প্রয়োজন। অন্যথায় শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে।
আরও পড়ুন:








