বৃহস্পতিবার

৭ মে, ২০২৬ ২৪ বৈশাখ, ১৪৩৩

খেলাপি দেশবন্ধুর ঋণ মওকুফের সুপারিশ এমপির

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ মে, ২০২৬ ১৩:১৭

আপডেট: ৭ মে, ২০২৬ ১৩:১৭

শেয়ার

খেলাপি দেশবন্ধুর ঋণ মওকুফের সুপারিশ এমপির
ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাভোগী শিল্পগোষ্ঠী দেশবন্ধু গ্রুপ এবার বিএনপি সরকারের কাছ থেকেও সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই শিল্পগোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জোরালো সুপারিশ করেছেন কুমিল্লা-৬ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) মনিরুল হক চৌধুরী। দেশবন্ধু গ্রুপের ৫ হাজার ৩৯২ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ এবং চলতি মূলধন হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকার নতুন ঋণ প্রদানের জন্য তিনি একটি ডিও লেটার (বিশেষ আধা-সরকারি পত্র) দিয়েছেন।

গত ২৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে পাঠানো পত্রে মনিরুল হক চৌধুরী দাবি করেছেন, দেশবন্ধু গ্রুপ গত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ভয়াবহ আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত, যা দ্রুত সমাধান করা না গেলে একদিকে যেমন শিল্পগোষ্ঠীটির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে। এতে বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশবন্ধু সুগার মিলসের জন্য ব্যাংক থেকে নেয়া ১০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকার মধ্যে ১০ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। একই সময়ে গ্রুপটির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঋণসহ মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১২ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর কাছে এখনো ৫ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা অনাদায়ী রয়েছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ১৪২ কোটি টাকা শুধু সুদের অংশ। অর্থাৎ মূল ঋণের তুলনায় সুদের বোঝাই এখন বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গ্রুপটি চিনি বিক্রির ক্ষেত্রে সুদ যোগ করার দাবি জানালেও ব্যাংকগুলো সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। অন্যদিকে, মূল ঋণ পরিশোধের অঙ্ককেই বড় করে তুলে ধরা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফার দাবি অনুযায়ী, তারা এসব ঋণের সিংহভাগ পরিশোধ করলেও ব্যাংকগুলো বিপরীত তথ্য দিচ্ছে। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে গ্রুপটির দাবি পাওনা ৪০৩ কোটি টাকা, কিন্তু ব্যাংকের হিসেবে তা ৭৭২ কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে গ্রুপের দাবি পাওনা ৩২৮ কোটি টাকা হলেও ব্যাংক বলছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। তবে এর বাইরে অন্য ঋণের বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।

ডিও পত্রে দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেডের ইতিহাস বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চিনিকলটি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। চিঠিতে চিনি শিল্পের চলমান সংকটের পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো চিনি আমদানিতে নীতিগত জটিলতা, বিশেষ করে এসআরও জারি এবং আইনি প্রতিবন্ধকতা। পাশাপাশি বাংলাদেশ ট্যারিফ ও ট্রেড কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত মূল্য কাঠামো উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এমপির সুপারিশে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা চিনির মূল্য, পরিশোধন ব্যয় এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়েই দেশে চিনির মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে দেশীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে এবং ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে পড়ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকায় দেশবন্ধু গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, আর্থিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। খেলাপি হওয়ায় ২০২৩ সাল থেকে দেশবন্ধু গ্রুপের এলসি সুবিধা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে। জানা গেছে, দেশবন্ধু গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধা নেয়ার অভিযোগে আলোচিত। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই শিল্পগোষ্ঠী নীতিগত সুবিধা, ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ এবং বিভিন্ন প্রণোদনা পেয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। নীতিগত সহায়তা এবং ঋণ সুবিধার ধারাবাহিকতা থেকে এটি স্পষ্ট যে, গ্রুপটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল না।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশবন্ধু গ্রুপ অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিদেশি ঋণ গ্রহণ করে বলে জানা যায়। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখার মাধ্যমে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয় এবং বিদেশি ব্যাংক থেকে ছয় মাস মেয়াদি স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়ে পণ্য আমদানি করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে ওই ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংকটির ৩৯০ কোটি টাকার ফোর্স লোন সৃষ্টি হয়। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা শেয়ারবাজার থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেন। বিশেষ করে দেশবন্ধু পলিমার লিমিটেডের শেয়ার কারসাজির ঘটনা আলোচনায় আসে। ২০২৩ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরের জন্য কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ (২৫ পয়সা) লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পরদিনই শেয়ারের দাম ১৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে যায়, যা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের অভিযোগকে আরও জোরালো করে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো— দেশবন্ধু গ্রুপ ব্যাংক ও শেয়ারবাজার থেকে আত্মসাৎ করা অর্থের ভাগ দিয়ে মন্ত্রীদের আনুগত্য কিনে নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারের পতন পর্যন্ত গ্রুপটির ওপর কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেননি আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্বশীলরা। এসব ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এই বাস্তবতায় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী তার পত্রে দেশবন্ধু গ্রুপকে পুনরুজ্জীবিত করতে কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন। তার প্রস্তাবনায় প্রথমত, ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে নতুন করে আর্থিক কাঠামো তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এলসি সুবিধা পুনর্বহাল করে উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। তৃতীয়ত, বিদ্যমান সুদ মওকুফ করে তা একটি পৃথক হিসাবে স্থানান্তর এবং মূল ঋণ ১৫ বছরে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, সঙ্গে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো খেলাপি অবস্থাতেও নতুন করে ১ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ প্রদান, যা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে দাবি করা হয়েছে। পত্রে একটি বিকল্প অর্থায়ন কাঠামোর কথাও উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়, বিদেশি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে হংকংয়ে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান (এসপিভি) গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) সুবিধা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ারও প্রস্তাব রাখা হয়েছে।



banner close
banner close