দেশের আর্থিক খাতের দুই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) শীর্ষ নেতৃত্বে চলতি সপ্তাহেই বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। বিএসইসির বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে এবং আইডিআরএ-র শূন্য পদে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের মাধ্যমে সরকার বাজার সংস্কারের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
দুই সংস্থার শীর্ষ পদে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগের পথ প্রশস্ত করতে সরকার ইতোমধ্যে আইনে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এনেছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন’ এবং ‘বিমা আইন’ সংশোধনের বিল পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে বিএসইসি চেয়ারম্যানের ৬৫ বছর এবং আইডিআরএ চেয়ারম্যানের ৬৭ বছরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা তুলে দেয়া হয়েছে। এই সংশোধনীর গেজেট চলতি সপ্তাহেই প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিএসইসির সম্ভাব্য তালিকায় ডজনখানেক নাম, আলোচনায় যারা অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিএসইসির পরবর্তী চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে প্রায় এক ডজন ব্যক্তির নাম জমা পড়লেও আলোচনায় এগিয়ে আছেন তিন জন। তাদের মধ্যে ড. মো. ফরিদুল ইসলাম। তিনি সরকারের সাবেক সচিব এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। সাইফুল ইসলাম ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) বর্তমান সভাপতি। মাসুদ খান যিনি একাধিক বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পেশাদার। আলোচনায় থাকলেও মাসুদ খানের সম্ভাব্য নিয়োগ নিয়ে বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মাসুদ খান ও তার পরিবার পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত এবং নিয়ন্ত্রনাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের বড় অংকের শেয়ারের মালিক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এইজ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানটির ৫০ লাখ শেয়ারের মধ্যে মাসুদ খান ও তার পরিবারের হাতেই রয়েছে ৩০ লাখ (৬০ শতাংশ) শেয়ার। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিজের মালিকানাধীন অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে তাকে নিয়োগ দিলে তা সরাসরি 'স্বার্থের সংঘাত' তৈরি করবে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল তাদের গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে তাকে পদে বসাতে তৎপর রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। অভিযোগ আছে, একটি কুচক্রী মহলের প্রভাবে মিউচুয়্যাল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫ ও মার্জিন রুলের মতো কিছু বিতর্কিত আইন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ডিএসইর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "বর্তমান চেয়ারম্যানের ওপর থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। বাজার গতিশীল করতে দ্রুত পরিবর্তন জরুরি।"
সাবেক চেয়ারম্যান এম আসলাম আলমের পদত্যাগের পর থেকে আইডিআরএ-র শীর্ষ পদটি শূন্য রয়েছে, ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে দাপ্তরিক কার্যক্রম। এই পদে আইএমইডি-র সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়জুল্লাহর নাম জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, সরকার এমন একজনকে বিএসইসিতে চাচ্ছে যিনি স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সাথে বাজার পরিচালনা করবেন। লক্ষ্য হলো বাজারে গতি ফিরিয়ে আনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, "বিনিয়োগকারীর পুঁজি যেন নিরাপদ থাকে নতুন নেতৃত্বের কাছে এটিই প্রধান প্রত্যাশা। স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে না পারলে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে না।"
খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এখনো পদত্যাগ না করলেও মন্ত্রণালয় সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে, নতুন চেয়ারম্যান চূড়ান্ত হওয়ার সাথে সাথেই বর্তমান চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেয়া হবে অথবা তিনি নিজেই সরে দাঁড়াবেন। চলতি সপ্তাহেই পুঁজিবাজার ও বীমা খাতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:








