দেশের কর ব্যবস্থার পরিধি বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর গ্রাম পর্যায়ে ভ্যাট সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত নীতিগত পরিকল্পনা অনুযায়ী, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি, কর-জিডিপি অনুপাত উন্নয়ন এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য মাসিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার টোকেন ভ্যাট চালুর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর প্রদানে অভ্যস্ত করা এবং কর প্রশাসনের জটিলতা কমানোর চেষ্টা করা হবে। তবে অতীতে প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় নতুন এই প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে সতর্কতা দেখা দিয়েছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা ও ট্রেড লাইসেন্স পেতে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বিআইএন বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এর ফলে কর প্রশাসন সরাসরি ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবে এবং করদাতার সংখ্যা বাড়বে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের বিআইএন থাকলেও নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন জমা দেয় ৫ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ, যার ৯৯ শতাংশই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং অধিকাংশ গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে করের আওতায় আনা রাজস্ব বৃদ্ধির বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী থাকায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কর অব্যাহতি কমানোর পাশাপাশি করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সতর্কতার কথা বলছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় স্বচ্ছ ও সহজ পদ্ধতিতে নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অনানুষ্ঠানিক খরচ ও হয়রানি বাড়লে উদ্যোগটি ব্যাহত হতে পারে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, হঠাৎ করে বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে নিরুৎসাহিত হতে পারেন, যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে দেশের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হলেও রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ এই দুই অঞ্চল থেকেই আসে। ফলে গ্রামীণ এলাকায় ভ্যাট সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই বৈষম্য কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তথ্য ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বিপুল সংখ্যক হিসাব থাকলেও কতগুলো ব্যবসায়িক হিসাব তা নির্দিষ্টভাবে জানা নেই। একইভাবে সক্রিয় ট্রেড লাইসেন্সধারী ব্যবসার নির্ভরযোগ্য ডাটাবেজের অভাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর ভ্যাট ব্যবস্থার জন্য আগে একটি সমন্বিত ও হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ধাপে ধাপে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে প্রস্তাবটি নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন:








