২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন অবস্থায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও চারটি অডিট প্রতিষ্ঠানের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই বিপুল সংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়, যা স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাত বছরে ব্যাংকটিতে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মকর্তা নিয়োগ পান। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৫৪২ জন কোনো জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত। অডিটে উল্লেখ করা হয়, মোট নিয়োগের প্রায় ৭৫ শতাংশই এমন অনিয়মিত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে।
২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ শুরুর সময় ব্যাংকটির মোট কর্মী সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৫১৫ জন। ২০২৪ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৭০৬ জনে। একই সময়ে প্রায় দুই হাজার কর্মী অবসরে যান।
ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল উদ্দিন জসিম জানান, সে সময়ে কোনো ধরনের লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। পরবর্তীতে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কিছু কর্মকর্তা আদালতে রিট করলে প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। আগ্রহী প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও উঠে আসে।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালায় ৭.০৪ নম্বর একটি বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়োগ প্রক্রিয়া শিথিল করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই ধারার অপব্যবহার করে নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কার্যত অকার্যকর করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মোট নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ১০৪ জন চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা, যার মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জন পটিয়া উপজেলার। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে কর্মরত কর্মকর্তা ছিলেন ৮১১ জন, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৫৮ জনে। পটিয়া উপজেলায় এই সংখ্যা ৪২ থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৩৩১ জনে পৌঁছায়, যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিটে আরও বলা হয়, চট্টগ্রামের পটিয়া ও আসাদগঞ্জ এলাকায় এস আলম গ্রুপ চেয়ারম্যানের বাসভবনে সিভি জমা দেওয়ার জন্য পৃথক বাক্স রাখা হতো। সেখান থেকে বাছাই করা আবেদনপত্র প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে পূর্বনির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হতো।
এছাড়া অনুমোদিত জনবলের বাইরে প্রায় ২ হাজার ৯০০ অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, যা সাত বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক ছয়টি ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। এ বিষয়ে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এক যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষায় ৫ হাজার ৩৭৪ জন কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪০২ জন অংশ নেন এবং অংশগ্রহণকারীদের সবাই উত্তীর্ণ হন।
পরবর্তীতে অযোগ্যতা ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়া এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ প্রদান ব্যাংকটির পেশাদারত্ব ও সুশাসনকে দুর্বল করেছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, এ ধরনের নিয়োগ স্বজনপ্রীতির ইঙ্গিত দেয় এবং যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। অন্যথায় ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
আরও পড়ুন:








