দেশের কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে ঋণ খেলাপির বড় অংশ মাত্র ১০টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে মোট ৭২ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মধ্যে ৪৯ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৬৮ দশমিক ৩০ শতাংশই রয়েছে শীর্ষ ১০ ব্যাংকে। অথচ মোট সিএমএসএমই ঋণের ৩৮ শতাংশেরও কম বিতরণ করেছে এসব ব্যাংক। বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি ব্যাংকের উচ্চ খেলাপির প্রভাবেই পুরো খাতে ঝুঁকি বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিএমএসএমই খাতে বিতরণ হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এর আগের বছরগুলোতে এ হার আরও বেশি ছিল। ২০২৩ সালে এ খাতে ঋণের অংশ ছিল ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। ফলে ধারাবাহিকভাবে ছোট ঋণের অংশ কমে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।
নীতিগতভাবে সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ঋণের অন্তত ২৫ শতাংশ এবং ২০২৯ সালের মধ্যে ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র লক্ষ্য থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম ঝুঁকি ও বেশি মুনাফার কারণে করপোরেট ঋণে বেশি আগ্রহ দেখায়। তবে বড় ঋণের খেলাপি বেড়ে যাওয়ায় কিছু ব্যাংক এখন চাপের মুখে রয়েছে, যা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে প্রভাব ফেলছে।
সিএমএসএমই খাতে ঋণ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা দিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে সাধারণ ঋণ ও স্বল্পমেয়াদি বকেয়া ঋণের ক্ষেত্রে প্রভিশন হার কমিয়ে ০ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে বেশি ছিল। এছাড়া নারীদের জন্য জামানতবিহীন ২৫ লাখ টাকা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। টিআইএন না থাকলেও ব্যবসায়িক সনদ দিয়ে ক্ষুদ্র ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবু ব্যাংকগুলোর আগ্রহ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, বড় করপোরেট গ্রুপের ঋণ খেলাপিই এই উচ্চ হারের প্রধান কারণ।
সিএমএসএমই খাতে খেলাপি ঋণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির ২৯ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে ৯ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। এরপর রয়েছে বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংক।
এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক-এও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে।
অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে কিছু ব্যাংকে এ খাতে খেলাপির হার নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক-এর সিএমএসএমই ঋণের বিপরীতে খেলাপির হার ২ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা খাতটির গড়ের তুলনায় অনেক কম।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সিএমএসএমই খাতে লক্ষ্য অর্জনে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ কৌশলে পরিবর্তন আনা জরুরি। একই সঙ্গে খেলাপি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকি না বাড়ালে এই খাতের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আরও পড়ুন:








