রবিবার

৩ মে, ২০২৬ ২০ বৈশাখ, ১৪৩৩

ডলারের সঙ্গে অন্য মুদ্রার দামও বেড়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ মে, ২০২৬ ০৬:৩২

শেয়ার

ডলারের সঙ্গে অন্য মুদ্রার দামও বেড়েছে
ছবি সংগৃহীত

দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল থাকার পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও নড়াচড়া শুরু হয়েছে। মার্কিন ডলারের দর ১২২ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডলারের পাশাপাশি অন্যান্য প্রধান বিদেশি মুদ্রার দরেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য লেনদেনের প্রধান মুদ্রাই হলো ডলার।

ডলারের দাম কম-বেশি হলে সেটা সারা বিশ্বেই প্রভাব পড়ে। তাই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বাজারেও পড়েছে। ফরওয়ার্ড সেলের কারণে সম্প্রতি দেখা গেছে ডলারের দাম কিছুটা বেড়েছে। তাই টাকার মানও কিছুটা কমেছে।

এখন পুরোপুরিভাবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে ডলারের দাম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ডলারসহ অন্যান্য মুদ্রার দাম পাঁচ পয়সা থেকে শুরু করে ৫.৭৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তথ্য মতে বছরের শুরুতে অর্থাৎ ১ জানুয়ারি প্রতি ইউরোর দর ছিল ১৪৩ টাকা ৬৪ পয়সা। কিন্তু ৩০ এপ্রিল সেই একই ইউরোর জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে ১৪৩ টাকা ৩৩ পয়সা।

সুতরাং চার মাসে প্রতি ইউরোর দাম ১০ পয়সা কমেছে। ব্রিটিশ পাউন্ডের দর বেড়ে হয়েছে ১৬৫ টাকা ৩৮ পয়সা, যা আগে ছিল ১৬৪ টাকা ৭৭ পয়সা। অস্ট্রেলিয়ান ডলার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৮১ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ৮৭ টাকা ৩৪ পয়সায় উঠেছে।

ডলারের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্ববাজারে না বাড়লেও বাংলাদেশের বাজারে ডলারের দাম সম্প্রতি বেড়েছে। এর প্রধান কারণ প্যানিক বাই হতে পারে।

কারণ অনেক বায়ার মনে করছেন, আগামীতে পেমেন্টের সময় এলে হয়তো ডলার পাওয়া যাবে না। কেননা বিশ্ববাজারের তেলের কারণে অস্থিরতা বিরাজ করছে। তাই বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে বেশি দরে ডলার কিনে আমদানিকারকদের চাহিদা মেটাচ্ছে অনেক ব্যাংক। হয়তো এ কারণেই ডলারের দাম বেড়েছে। আর ডলারের ওপর নির্ভর করে আমাদের দেশে অন্যান্য মুদ্রার দামও ওঠা-নামা করে।

এ ছাড়া কানাডিয়ান ডলার ৮৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ৮৯ টাকা ৬৯ পয়সা হয়েছে। সুইডিশ ক্রোনা ১৩ টাকা ২৬ পয়সা থেকে কমে ১৩ টাকা ১৫ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। সিঙ্গাপুর ডলারের দরও বেড়ে ৯৫ টাকা ৭৭ পয়সা হয়েছে, যা আগে ছিল ৯৫ টাকা ৬ পয়সা।

চীনা ইউয়ান ১৭ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ১৭ টাকা ৯২ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। জাপানি ইয়েনের দর কিছুটা কমে ০.৭৮ টাকা থেকে ০.৭৬ টাকায় নেমেছে।

অন্যদিকে ভারতীয় রুপি এক টাকা ৩৬ পয়সা থেকে কমে এক টাকা ২৯ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। তবে শ্রীলঙ্কান রুপির দর বেড়ে দুই টাকা ৫৩ পয়সা থেকে দুই টাকা ৬০ পয়সায় উন্নীত হয়েছে।

সার্বিকভাবে ডলারের পাশাপাশি অধিকাংশ বিদেশি মুদ্রার দর বাড়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে রপ্তানি ও প্রবাস আয়ের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষক শাহ মো. আহসান হাবিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডলারের পাশাপাশি অন্যান্য বিদেশি মুদ্রার দাম বাড়ার কারণও ডলার। কারণ আমাদের লেনদেনের প্রধান মুদ্রাই হলো ডলার। ডলারের দাম কম-বেশি হলে সেটা সারা বিশ্বেই প্রভাব পড়ে। তাই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বাজারেও পড়েছে। সমপ্রতি দেখা গেছে, ডলারের দাম কিছুটা বেড়েছে। তাই টাকার দামও কিছুটা কমেছে। এখন পুরোপুরিভাবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে ডলারের দাম।’

তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে ডলারের দাম বাড়লেও কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। যদিও বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আর ডলারের দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে না। তার পরও ডলার কেনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করছে প্রকৃত দামের কাছাকাছি রাখতে। এটাকে বলা হয় ম্যানেজ ফ্লোটিং। ডেপ্রিসিয়েশন ভালো আমি এটা বলছি না। কিন্তু বাজারকে বাজারের মতো চলতে দেওয়া উচিত। ম্যানেজ ফ্লোটিং করার কারণ রিজার্ভ বাড়ানো। এখন আমাদের দেশের সবচেয়ে আশার জায়গা হলো রেমিট্যান্স। বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখার জন্য হলেও বাংলাদেশ ব্যাংককে সক্রিয় থাকা উচিত।

এদিকে, স্পট মার্কেটে কৃত্রিম ডলার সংকট তৈরি হয়ে দাম যাতে না বাড়ে, সে লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ফরওয়ার্ড ডলার বুকিংয়ে যেতে নিরুৎসাহ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফরওয়ার্ড বুকিং বেড়ে গেলে স্পট মার্কেটে ডলারের সরবরাহ কমে চাপ তৈরি হতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক মৌখিকভাবে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ডলারের দাম বাড়তে থাকে। ভবিষ্যতে দাম আরো বাড়তে পারে এমন ধারণা থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফরওয়ার্ড বুকিংয়ের প্রবণতা বেড়েছিল।

ফরওয়ার্ড বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি হলো এমন একটি লেনদেন, যেখানে কোনো ব্যাংক বা পক্ষ ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট সময়ে পূর্বনির্ধারিত বিনিময় হারে নির্দিষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির অঙ্গীকার করে। বিনিময় হার ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যবসা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো কেবল গ্রাহকের প্রকৃত প্রয়োজনের বিপরীতে ফরওয়ার্ড বিক্রি করতে পারবে এবং এসব চুক্তির উদ্দেশ্য হতে হবে বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি কমানো। ব্যাংকগুলো রপ্তানিকারক, ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট হোল্ডার ও এক্সচেঞ্জ হাউসসহ বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে ফরওয়ার্ড ডলার কিনতে পারে। তবে নিজেদের ঝুঁকি দ্রুত সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফরওয়ার্ড মূল্য নির্ধারণ করা হয় বর্তমান দামের সঙ্গে প্রিমিয়াম যোগ করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ফরওয়ার্ড চুক্তি পরিশোধে স্পট মার্কেট থেকে কেনা ডলারের ওপর নির্ভর না করতে ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বরং নিজস্ব ফরওয়ার্ড ক্রয়ের বিপরীতে ফরওয়ার্ড বিক্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘অল্প কয়েকটি ব্যাংক ফরওয়ার্ড বুকিং বেশি করছিল। বিষয়টি নজরে আসার পর ব্যাংকগুলোকে তা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কারণ ফরওয়ার্ড বুকিং বাড়লে স্পট মার্কেটে চাপ তৈরি হয় এবং ডলারের দর বাড়ার আশঙ্কা থাকে। প্রতিদিন স্পট মার্কেটে চাহিদা অনুযায়ী ডলার সরবরাহ না থাকলে দাম বাড়ে। তাই অতিরিক্ত ফরওয়ার্ড বুকিং ডলারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। দৈনন্দিন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে স্পট মার্কেট থেকেই ডলার সংগ্রহ করা হয়।’



banner close
banner close