শনিবার

২ মে, ২০২৬ ১৯ বৈশাখ, ১৪৩৩

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক অনিশ্চয়তায়, সরে দাঁড়াচ্ছে অংশীদাররা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ মে, ২০২৬ ০৮:১৫

শেয়ার

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক অনিশ্চয়তায়, সরে দাঁড়াচ্ছে অংশীদাররা
ছবি সংগৃহীত

দেশের পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি কার্যক্রম শুরুর প্রায় পাঁচ মাস পর নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রত্যাশিত আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনে ব্যর্থতা, গ্রাহকসেবায় ধীরগতি এবং অংশীদার ব্যাংকগুলোর সরে যাওয়ার উদ্যোগ—এসব কারণে এই একীভূত কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে একটি ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছে এবং আরেকটি একই পথে অগ্রসর হচ্ছে।

গত বছরের ২১ ডিসেম্বর ঢাকায় এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে এই নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন, তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।

তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকের কার্যক্রম এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া ধীরগতির এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমা মানা হচ্ছে না। এতে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা আরও বেড়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড একীভূত কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। ব্যাংকটির সাবেক পরিচালক জাবেদুল আলম চৌধুরী জানান, ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ আইনের ১৮(ক) ধারার সুযোগ নিয়ে এই আবেদন করা হয়েছে এবং এতে সাবেক পর্ষদের সম্মতি রয়েছে। একই সময়ে এক্সিম ব্যাংকও একই ধরনের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৮ শতাংশ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা এবং মোট ঋণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় দুর্বল আর্থিক ভিত্তির ওপর একীভূত কাঠামো গড়ে তোলায় ঝুঁকি থেকেই গেছে।

ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সহায়তা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় নীতিগত সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি প্রণীত ব্যাংক রেজ্যুলেশন কাঠামোতে লিকুইডেশন, ব্রিজ ব্যাংক, নতুন বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তরসহ বিভিন্ন বিকল্প রাখা হয়েছে। ১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়ায় সাবেক শেয়ারধারীদের ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৯১ লাখ ৫০ হাজার হিসাব এবং ১৫ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছে। তবে অনেক শাখায় গ্রাহক উপস্থিতি কমেছে, নতুন আমানত কম জমা হচ্ছে এবং উত্তোলনে সীমাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তি বাড়ছে।

ব্যাংকের এক শাখা ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পেলে ধাপে ধাপে গ্রাহকসেবা স্বাভাবিক করা সম্ভব। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, একীভূত প্রক্রিয়া এখনও চলমান এবং পরিচালনা কাঠামো শক্তিশালী করার কাজ চলছে। পরিস্থিতি উন্নত হলে ব্যাংকটি পুনরায় বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের স্বাগত জানানো হবে।

এদিকে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক তাদের প্রস্তাবে পৃথকভাবে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। এতে খেলাপি ঋণ কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হ্রাস, মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করা এবং সরকারি হিসাব পুনরায় চালুর মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন এবং এর জন্য শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সংকট উত্তরণে নীতিগত স্থিতিশীলতা, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।



banner close
banner close