শুক্রবার

১ মে, ২০২৬ ১৮ বৈশাখ, ১৪৩৩

রাজধানীর যানজটে এক দশকে ক্ষতি পাঁচ লাখ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১ মে, ২০২৬ ০৭:৪২

শেয়ার

রাজধানীর যানজটে এক দশকে ক্ষতি পাঁচ লাখ কোটি টাকা
ছবি সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকায় সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার সমন্বয়হীনতায় সৃষ্ট যানজটে গত এক দশকে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবছর এই ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকা বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন খাতে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব, দুর্বল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অদক্ষতাই এই বিশৃঙ্খলার মূল কারণ। ২০১২ সালে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় আনার লক্ষ্যে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) গঠন করা হলেও বাস্তবে সংস্থাটির কার্যকর ক্ষমতার অভাবে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।

সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, রাজধানীর পরিবহন পরিকল্পনা, প্রকল্প অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব ডিটিসিএর ওপর ন্যস্ত। তবে ট্রাফিক পুলিশ, সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিএমটিসিএলসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির গাজীপুরে এক সভায় বলেন, শুধু যানজটের কারণেই রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। তিনি সতর্ক করে বলেন, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের মতো অর্থনৈতিক করিডরগুলো সচল রাখতে না পারলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে।

অন্যদিকে, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা জানান, যানজটের কারণে প্রতিবছর বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং এই ক্ষতির অর্থ দিয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার যানজট দেশের জিডিপির ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতির কারণ হচ্ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি কমে ঘণ্টায় মাত্র ৪.৮ কিলোমিটারে নেমে এসেছে, যা ২০০৭ সালে ছিল ২১ কিলোমিটার। প্রতিদিন প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার অর্থমূল্য দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা।

শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, যানজটজনিত বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পরিবেশদূষণের কারণে দেশে ৭৮ হাজার থেকে ৮৮ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে, যার একটি বড় অংশের জন্য দায়ী যানবাহনজনিত দূষণ।

ডিটিসিএ ২০১৬ সালে সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুমোদন করে, যেখানে মেট্রোরেল, বিআরটি ও সড়ক নেটওয়ার্ক সমন্বিত একটি আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতার অভাবে অগ্রগতি ধীর।

বিশেষ করে বাস রুট নির্ধারণে সমন্বয়হীনতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বর্তমানে প্রায় ৯ হাজার বাস ২৯১টির বেশি রুটে চলাচল করছে। এই বিশৃঙ্খলা কমাতে ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ প্রকল্পের আওতায় রুট সংখ্যা ৪২টিতে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। একই সময়ে ট্রাফিক পুলিশের আলাদা পরিকল্পনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

ডিটিসিএর কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, অন্যান্য সংস্থার পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ট্রাফিক পুলিশ বলছে, তারা সমন্বিতভাবেই কাজ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রুট পুনর্বিন্যাস করছে।

সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলেও সব সংস্থা একযোগে কাজ করলে রাজধানীর যানজট নিরসন করে একটি কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।



banner close
banner close