শুক্রবার

১ মে, ২০২৬ ১৮ বৈশাখ, ১৪৩৩

কঠিন শর্তের ঋণে বাড়ছে চাপ, স্বস্তি মিললেও সামনে ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১ মে, ২০২৬ ০৭:৩২

শেয়ার

কঠিন শর্তের ঋণে বাড়ছে চাপ, স্বস্তি মিললেও সামনে ঝুঁকি
ছবি সংগৃহীত

রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বাড়তি ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে সরকার ক্রমেই উচ্চ সুদ ও কঠিন শর্তের বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ১.৯ বিলিয়ন ডলারের পাঁচটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার বড় অংশই অনমনীয় বা ‘নন-কনসেশনাল’ ঋণ। এতে স্বল্পমেয়াদে বাজেট ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত মঙ্গলবার শেরেবাংলানগরের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভায় এসব ঋণ অনুমোদন করা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয়, অনুমোদিত ঋণের মধ্যে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

এই বাজেট সহায়তার আওতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি) থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়া যাবে।

তবে এসব ঋণের সুদের হার ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে, যা প্রচলিত স্বল্পসুদী কনসেশনাল ঋণের তুলনায় বেশি। এডিবির একটি অংশে সুদের হার প্রায় ৪.১৩ শতাংশ এবং গ্রান্ট এলিমেন্ট মাত্র ৬.৬১ শতাংশ। এআইআইবির ঋণে সুদের হার ৫.০৮ শতাংশ এবং গ্রান্ট এলিমেন্ট ঋণাত্মক, যা ঋণকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।

বাজেট সহায়তার পাশাপাশি ঢাকা-সিলেট করিডর উন্নয়ন প্রকল্পে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পে মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ ও সার্ভিস লেন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এখানেও কার্যকর সুদের হার ৪ শতাংশের বেশি।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার অনমনীয় ঋণ গ্রহণে কিছু সীমা নির্ধারণ করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব ঋণের বার্ষিক পরিশোধ ব্যয় রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ বা সরকারি রাজস্বের ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে এবং মোট অনমনীয় ঋণ জিডিপির ১০ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে বাস্তবতা বলছে, বাজেট সহায়তা ঋণের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩.৪১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি এবং পাঁচ বছরে বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮.১১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তা ছাড় হয়েছে, বিপরীতে ২.৬ বিলিয়ন ডলার আসল পরিশোধ করা হয়েছে। ফলে নিট ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলার সংকট পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এসব ঋণ মূলত বাণিজ্যিক সুদের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, যা ব্যয়বহুল। প্রকল্প থেকে পর্যাপ্ত রিটার্ন না এলে ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজেট সহায়তা জরুরি হলেও ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা বাড়াতে হবে। মেগা ঋণ এড়িয়ে কেবল সেই প্রকল্পে বিনিয়োগ করা উচিত, যেগুলো থেকে দ্রুত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব।

ইআরডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ২০২৯-৩০ অর্থবছরেই সর্বোচ্চ প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের চাপ পড়বে।

অন্যদিকে, বড় প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় আসল পরিশোধ শুরু হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কিস্তি পরিশোধ শুরু হলে সামগ্রিক ঋণচাপ আরও বাড়বে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে রপ্তানি ও প্রবাস আয় বাড়ানো, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং রাজস্ব আহরণ জোরদার করা জরুরি। তা না হলে উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণ ভবিষ্যতে বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।



banner close
banner close