রবিবার

১১ অক্টোবর, ২০২৬ ২৬ আশ্বিন, ১৪৩৩

পরিবহন খাতে বছরে ৩৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:২৯

শেয়ার

পরিবহন খাতে বছরে ৩৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
ছবি সংগৃহীত

দেশের পরিবহন খাতে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নজরদারির ঘাটতি ও অনিয়মের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বর্তমানে মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার, বাস-মিনিবাস, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইভেট কার—এই পাঁচটি খাত থেকে সরকারের বার্ষিক আয় ৩ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা হলেও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে তা বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যানবাহন নিবন্ধন, ফিটনেস ফি, রুট পারমিট, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও বার্ষিক কর—এসবই রাজস্ব আয়ের বড় উৎস হতে পারত। কিন্তু আইন ও নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় সম্ভাবনার বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ফিটনেসবিহীন, নিবন্ধনহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের অবাধ চলাচলই এই ঘাটতির প্রধান কারণ। পাশাপাশি রুট পারমিট ছাড়া যান চলাচল ও কর ফাঁকিও বড় ভূমিকা রাখছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল খাত থেকে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও সম্ভাব্য আয় ২ হাজার ১ কোটি টাকার বেশি। এ খাতেই প্রায় ৬৪১ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রায় চার লাখ মোটরসাইকেল ফিটনেসবিহীন বা নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া চলাচল করছে।

সিএনজি ও এলপিজিচালিত থ্রি-হুইলার থেকে বর্তমান আয় প্রায় ৩৬২ কোটি টাকা, যেখানে সম্ভাব্য আয় প্রায় ৮৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতে প্রায় ৫১৭ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক খাতে। বর্তমানে এ খাত থেকে মাত্র ১৭ দশমিক ৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হচ্ছে, অথচ সম্ভাব্য আয় ৯০৫ কোটি টাকার বেশি। ফলে শুধু এই খাতেই প্রায় ৮৮৮ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশে ৪ থেকে ৫ লাখ ইজি বাইক অনিবন্ধিত অবস্থায় চলছে।

বাস ও মিনিবাস খাতে বর্তমানে প্রায় ১৯৮ কোটি টাকা আদায় হলেও সম্ভাব্য আয় ৬৭০ কোটি টাকা। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান খাতে বর্তমান আয় ২৭৫ কোটি টাকা, যা বাড়িয়ে ৬৯৭ কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব। প্রাইভেট কার খাতেও কর ফাঁকি ও ফিটনেস নবায়নের ঘাটতির কারণে প্রায় ৫৬০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু ঘটে। যদিও সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা অনেক কম। সড়কে অননুমোদিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নীতিমালায় বাসের ইকোনমিক লাইফ ২০ বছর, ট্রাকের ২৫ বছর এবং সিএনজি/এলপিজি থ্রি-হুইলারের ১৫ বছর নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে এসব নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার নিবন্ধিত যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই, যা প্রতিবছর ২০-৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এসব পুরনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন ঢাকার বায়ুদূষণের প্রায় ১০-১৫ শতাংশের জন্য দায়ী।

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার অন্যতম বড় কারণ তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। নিবন্ধন, ফিটনেস, কর ও রুট পারমিট—এই চারটি তথ্যভাণ্ডার এখনো সমন্বিত নয়, ফলে অনেক যানবাহন নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ফিটনেস ও নিবন্ধন নবায়ন বাধ্যতামূলক করা, অনিবন্ধিত যানবাহন আইনের আওতায় আনা, রুট পারমিট ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, মোবাইল কোর্ট ও নজরদারি জোরদার এবং স্ক্র্যাপনীতি কার্যকর করা।

তাঁরা মনে করেন, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ডেটাবেইস চালু এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিবহন খাত থেকেই সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে।